কাজী আবদুল বারী : এক স্বচ্ছ-চিন্তক রাজনীতিবিদ

ম্যাট্রিক পাস করার পর এক বছর রোজগারের ধান্ধায় ঘুরলাম। পরের বছর, উনিশশো পঞ্চান্ন সালে, নেত্রকোনা কলেজে ভর্তি হলাম। নেত্রকোনা কলেজে তখন ইন্টারমিডিয়েট ক্লাস খোলা হয়েছে। ছাত্রসংখ্যা একান্ত সীমিত। ফার্স্ট ইয়ার সেকেন্ড ইয়ার মিলিয়ে দেড়শোর বেশি নয়। আটজন অধ্যাপকের প্রায় সবাই ছিলেন তরুণ। সব মিলিয়ে যেন একটি ছোট্ট সুখী পরিবার।

কলেজর ছাত্র সংসদে আমি সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হই। সংসদের পক্ষ থেকে সারা বছর অনেক বিতর্কসভা ও সাহিত্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। অধ্যাপকবৃন্দ তত্ত্বাবধানের পাশাপাশি আমাদের সঙ্গে এ-সবে অংশগ্রহণও করতেন। আনুষ্ঠানিক বিতর্কের বাইরেও তাঁদের সঙ্গে আমরা নানা বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা ও তর্কবিতর্ক করতাম। রাজনীতি নিয়েও উত্তপ্ত আলোচনা হতো।

চার-এর দশক থেকেই নেত্রকোনা ছিল বামপন্থি রাজনীতির ঘাঁটি। কলেজেও বামপন্থি ছাত্রদেরই প্রতাপ। আমি যখন ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র তখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়তেন আবু তাহের, ফুলে হুসেন, আবদুল কুদ্দুস এবং এরকম আরও কয়েকজন তুখোড় ছাত্রনেতা। তখনো নেত্রকোনায় বামপন্থি ছাত্রসংগঠন 'ছাত্র ইউনিয়ন' গড়ে ওঠেনি, প্রগতিশীল সব ছাত্রই তখন ছাত্রলীগে। আমিও ছাত্রলীগে ভিড়ে গেলাম, হয়ে গেলাম মহকুমা ছাত্রলীগের অন্যতম সহ-সভাপতি। সে-সময়েই পরিচয় হলো কাজী আবদুল বারীর সঙ্গে। তিনি তখন ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। সাংগঠনিক সফরে নেত্রকোনা এসেছিলেন। তাঁর বক্তৃতা শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হলো: দেশি-বিদেশি রাজনীতির সবকিছুই যেন তাঁর নখদর্পণে। আন্ডারগ্রাউন্ড কম্যুনিস্ট পার্টির সঙ্গে যে কাজী বারীর যোগ আছে সে-কথাও আমার কানে কে যেন ফিসফিস করে বলে গেল। ফলে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেল।

ছাপ্পান্ন সাল শেষ হওয়ার আগেই-অক্টোবরে কি নভেম্বরে-ছাত্রলীগের ময়মনসিংহ জেলা সম্মেলন। ময়মনসিংহ সদর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, টাঙ্গাইল-পাঁচটি মহকুমা নিয়ে বিশাল ময়মনসিংহ জেলা। 'ছাত্রলীগ জিন্দাবাদ', 'ছাত্র ঐক্য জিন্দাবাদ' ধ্বনি দিতে দিতে আমরা ময়মনসিংহ টাউন হলের সম্মেলন স্থলে এসে উপস্থিত হলাম। সব মহকুমা থেকেই সম্মেলনের প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষকরা ময়মনসিংহ শহরে এসে জড়ো হয়েছিল। এদের মধ্যে আমাদের নেত্রকোনার প্রতিনিধি দলটিই ছিল সবচেয়ে বড়ো, জমায়েতের প্রায় অর্ধেক।

সম্মেলনে আমাদের কী ভূমিকা হবে সে বিষয়ে আগেই নেত্রকোনায় গিয়ে আমাদের সবক দিয়ে এসেছিলেন কাজী আবদুল বারী। প্রাঞ্জল বক্তৃতায় তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি আর ছাত্রসমাজের দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত চমৎকারভাবে আমাদের বুঝিয়েছিলেন, ছাত্রদের মাধ্যমেই প্রগতিশীল আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের আদর্শ ও কর্মসূচি যেহেতু প্রায় অভিন্ন; তাই এ দুটো আলাদা সংগঠন রাখা নিতান্তই অযৌক্তিক, দুই সংগঠন মিলে একটি ছাত্র সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। ছাত্রলীগের জেলা সম্মেলনে দুই সংগঠনের এক হওয়ার আওয়াজ তুলতে হবে।[১]

সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি আবদুল আউয়াল প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন। এসেছিলেন নির্মল সেন, তিনিও তখন ছাত্রলীগের অন্যতম কেন্দ্রীয় নেতা। বিশেষ আমন্ত্রণে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতা আনোয়ারুল আজিমও সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছিলেন। সম্মেলনের মূল অধিবেশনে নেতাদের বক্তৃতার সময় আমরা খুব জোর স্লোগান তুললাম- 'ছাত্র ঐক্য জিন্দাবাদ', 'ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়ন এক হও'। কাজী আবদুল বারী 'ছাত্রদের হাতেই দেশের ভবিষ্যৎ' উল্লেখ করে প্রাঞ্জল ভাষায় ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়নের সংযুক্তির পক্ষে জোরালো যুক্তি দিয়ে বক্তৃতা করলেন। নানা ধ্বনি তুলে আমরা তাঁর বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানালাম। ঐক্যের দাবিতে সম্মেলন জমজমাট হয়ে উঠল।

কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বোঝা গেল ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে সংযুক্তির সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে। আমাদের ঐক্যের স্লোগানের প্রচণ্ডতার সামনে তাঁদের বিব্রত অবস্থাটাও বেশ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল। আউয়াল সাহেব ছিলেন যথেষ্ট প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব সম্পন্ন মানুষ। তিনি কর্মীদের প্রবণতাটা আঁচ করে তাঁর বক্তৃতায় ঐক্য প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব ও আবশ্যকতা সম্পর্কে আবেগময়ী সূচনা দিয়ে সকলের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে নিলেন। কিন্তু পরক্ষণেই 'কিন্তু' দিয়ে আরম্ভ করে এমন কিছু বাক্য প্রয়োগ করে চললেন যার মধ্যে

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice