জাল ফেলা-জাল তোলা

মেঘনার পাড় ভেঙে একটা শাখানদী বেরিয়েছিল। তার নাম তিতাস। এখন সে বেশ বড় নদী। আমরা তারই তীরে বাস করি। তার জলের কিনারায় লগি গেড়ে আমরা নাওগুলো বেঁধে রাখি। তার পাড়ের মাটিতে ঘাসের উপর বাঁশের "আড়া" বেঁধে আমরা জালগুলো শুকোতে দিই। পল্লির ভেতর থেকে যে-পথ ঘাটে গিয়ে ঠেকেছে, তারই একপাশে মাটিতে গর্ত করে আমরা জালে গাব দিই, আরেক পাশে ডাঙায় তুলে আমরা না'য়ে দিই আলকাতরা।

আমরা এক সংসারে দুই ভাই। দাদা আর আমি। আমি ধরি মাছ, দাদা করে মাছের ব্যাপার। আমি নদীতে জাল ফেলি, জাল তুলি, রাজপুরে ঘাটে নিয়ে সে-মাছ নগদ দামে বেচে আসি। দাদা না'য়ে না'য়ে ঘুরে তার মাছের ডালি ভর্তি করে; সে ডালি শহরে বয়ে নিয়ে বিক্রি করে।

আগে আমাদের নাও জাল ছিল না। বাপ-দাদারা ছিল আলসে। পরের না'য়ে একদিন মাছ ধরত, দশদিন বসে বসে খেত।

একদিন আমি আর দাদা দেখলাম পরের না'য়ে খেটে আর পেট চলে না। নিজের কিছু করা চাই। আমি গেলাম ধানের ব্যাপারে, দাদা দিতে গেল 'ভাসার ক্ষেপ'। সুনামগঞ্জর 'খলার' মাছ কিনে না'য়ের ভেতর জীইয়ে সে-মাছ নারায়ণগঞ্জের ঘাটে বিক্রি করাকে আমরা 'ভাসার ক্ষেপ' দেওয়া বলি। যেখানে 'খেউ' থেকে হাজার হাজার বড়ো মাছ তুলে বেপারীদের নিকট বেচবার জন্য, আর পেট মাথা কেটে শুকোবার জন্য মাছ জড়ো করা হয়, তাকে আমরা 'খলা' বলি। আর 'খেউ' বলি—যেখানে গভীর জলে গাছ-গাছড়া ফেলে মাছের ঘরবাড়ি করে ছ'মাস রাখা হয়, তারপর একদিন জালের বেড়া দিয়ে গুটিয়ে এনে সে মাছ তোলা হয়।

'ভাসার ক্ষেপ' দিয়ে দাদা যে টাকা পেল, তাতে সে জমি কিনল। আমার ধান ব্যাপারের টাকা দিয়ে আমি করলাম নাও জাল।

পরের বছর আবার সে 'ভাসার ক্ষেপ' দিয়ে টাকা আনল। এবার করল হাল আর গোরু।

পড়শি নগরবাসী মালো দাদাকে একদিন ঠাট্টা করে ডেকে বলল: কী অ নইদাবাসী, তুমি কি জালের কাম ছাইড়া হালের কাম শুরু করলা নাকি? আছিলা জালুয়ার ছেইলা, তখন অইলা হালুয়ার ছেইলা।

দাদা শুধরে দিল: আছিলাম জালুয়ার ছেইলা, হইলাম "হালুয়ার ছেইলা"—নয়, "হালুয়া"। বাপ আমার জালুয়া ঠিকই আছে।

নগরবাসী উপদেশ দিল: হালে জালে দুই দিকেই হাত রাইখ্য, শুনছ নইদাবাসী, দুই দিকেই হাত রাইখ্য, বাপ-দাদার ব্যবসা একেবারে ছাইড় না।

কিন্তু দাদা মাছ ধরা ছেড়ে দিল।

সারারাত জাল ফেলে জাল তোলার পর আমি যখন সকালে বাড়িতে আসি, দাদা তখন লাঙ্গল কাঁধে গোরু হাঁকিয়ে মাঠে যায়। পাড়ার সব জেলেরাই রাতের "জালবাইস" করে বাড়িতে এসেছে, চোখে তাদের ঘুমের জড়তা, শরীরে তাদের রাত জাগার ক্লান্তি। দাদার নিদ্রাতৃপ্ত চোখ-মুখের দিকে চেয়ে তাদেরও মুখে ফোটে পরিহাস। হিংসায় তারা জ্বলে যায়, বলে: জেলের পুত হালে যায়, জালের দিকে ফিরে চায়।

মাঝে মাঝে যাও বা মাছ ধরত, এসব কথা শুনে দাদা তাও বন্ধ করে দিল। বলল: এবার থেকে জেলের সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আমি চাষা। শুনে জেলেরা মুখ টিপে হাসল।

একদিন সন্ধ্যার আগেই জাল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি। ক্ষেতের কাজ করে দাদা ফিরে এসে দেখে রাঁধবার মতো কিছু নেই। জেলের ছেলের আবার মাছের অভাব! বলে তিন-কোনা 'পেলুন' জাল আর গলা-সরু ‘কাঁধা-ডোলা’ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল! অনেকদিন পর জাল হাতে পেয়ে বুঝি তার মনে খুশির ঢেউ উপছে পড়ল—তিতাসের ঢেউয়ের মতন।

বর্ষার ভরন্ত ঘাট। একদিকে মেয়েরা শাড়ি বাঁচিয়ে কলসি ডুবিয়ে সাঁঝের জল ভরছিল, অন্যদিকে হুঁক্কা-কল্কে-তামাকের ডিবা আর আগুনের মালসা নিয়ে জেলেরা উঠছিল না'য়ে। জলের তলায় দুর্ভেদ্য জল-বন, তারই পাশে পাশে 'গাং-করলা' মাথা তুলবার চেষ্টা করছে। দাদা জাল ডুবিয়ে সেই জল-বনে খোঁচাচ্ছে, আর গান

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice