রাতুল অন্তর্ধান রহস্য
সকালের নাস্তা সকাল-সকাল শেষ করার জন্য বড় বড় নাস্তার ডিমগুলি সামনে রেখে আমরা সবাই গোল হয়ে বসে আছি। নানাবাড়ির রান্নাঘরের লাগোয়া ঘরটার মেঝেতে পাটি বিছিয়ে খাওয়ার আয়োজন করা হয়েছে। লাল আটার মোটা মোটা রুটি, বুটের ডাল, পাঁচ রকমের মিশেলে দেওয়া সবজির নিরামিষ, গরুর মাংসের ভুনা, নারকেলের সন্দেশ আর রসমালাই নিয়ে নানাভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছি, তিনি এলেই খাওয়া শুরু হবে। এত সব খাবার অবশ্য প্রতিদিন হয় না। ঢাকা থেকে মেজ খালারা এসেছেন, তাদের জন্যই এই স্পেশাল আয়োজন।
পুবের ঘর থেকে নানাভাইয়ের কোরান-শরিফ পড়ার মিষ্টি করুণ সুর ভেসে আসছে। তিনি সকাল সাতটা পর্যন্ত কোরান-শরিফ পড়বেন সে তো এখনও প্রায় দু’তিন মিনিট বাকি। সামনে খাবারের মন ভুলানো গন্ধে ছোটরা সব উদাস হয়ে যাচ্ছে। এরই মাঝে মহাখাদক মনি সবার চোখ এড়িয়ে সন্দেশের থালায় হাত দিতে গিয়ে ধরা পড়েছে মুক্তা মামার সন্ধানী চোখে। অবশ্য মনি তাতে একটুও লজ্জা না পেয়ে সপ্রতিভ একটা হাসি দিয়ে বলল, ‘দেখলাম কেউ ধরতে পারে কিনা’।
মনির পাশে বসে লিলি খালা আর রবিন সেই সকাল থেকেই শার্লক হোমস আর ফেলুদা এই দুই গোয়েন্দাকে নিয়ে তর্ক করছে তো করছেই। দুজনই ডিটেকটিভ বইয়ের পোকা। তবে লিলি খালা শার্লক হোমস আর রবিন ফেলুদার ভক্ত। দুজনের মধ্যে কে বড় গোয়েন্দা কে জানে! কিন্তু দুই ভক্ত কাউকে এক ইঞ্চি ছাড় দিতে রাজি নয়।
বাড়ির পেছনের নারকেল বাগান থেকে মেজ খালার উচ্চকণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। তিনি তার ছোট মেয়ে রাতুলকে ডাকছেন। কিছুক্ষণ আগেই পিচ্চির দল সেখানে হইচই করে চোর-পুলিশ খেলছিল। খাওয়ার কথা শুনে সবাই এসেছে। শুধু রাতুল আসেনি।
আর তখনি নানাভাইয়ের কোরান-শরিফ পড়া শেষ হলো। তিনি এসে নাস্তার আসরে বসতে-না-বসতেই মনি একটা রুটি শেষ করে ফেলল। খেতে খেতে গল্প করা নানাভাইয়ের এক অভ্যাস। বসেই তিনি শুরু করলেন, কবে চাঁটগার পাহাড়ে এক ইংরেজ সাহেবের সাথে বন-মোরগ শিকার নিয়ে ঝগড়া বেঁধেছিল, মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী আবার লিয়ন সিংকে হারাতে পারবেন কিনা, এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলে কে চ্যাম্পিয়ান হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা দু-এক কথায় জবাব দিলেও মনির সেদিকে একেবারেই খেয়াল নেই। সে একমনে খেয়ে চলেছে এবং এরই মাঝে সাতটা রুটি শেষ করে আট নম্বরটা হতে চলছে।
এমন সময় মেজ খালা এসে তার বড় মেয়ে জাকিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘রাতুল কোথায় রে! ওকে তো কোথাও দেখছি না!
জাকিয়া কিছু বলার আগেই ওর ছোটভাই আকিক চকাম চকাম করে সন্দেশ খেতে খেতে বলল, ‘পুকুর-ঘাটেই তো দেখেছিলাম’।
আমি খাওয়া শেষ করে হাত মুছছিলাম। বললাম, ‘দাঁড়াও দেখে আসছি’।
লিলি খালার খাওয়াও শেষ। বলল, ‘চল, আমিও যাই’।
হাঁটতে হাঁটতে আমি বললাম, ‘এই পিচ্চি আর কদ্দূর যাবে’।
এলাচদানা চিবুতে চিবুতে লিলি খালা সবজান্তার ভাব নিয়ে বলল, ‘আছে হয়তো পুতুল কিংবা লাবলুদের বাড়িতে’।
লাবলুদের বাড়িতে গেলাম, রাতুল নেই। নানাভাইয়ের মস্ত নারকেল বাগান পেরিয়ে পুতুল মাসির বাড়িতে খোঁজ নিলাম, রাতুলকে পেলাম না। আমি একটু ভয় পেয়ে গেলাম। লিলি খালার দিকে চেয়ে দেখি ওর মুখের সবজান্তার ভাবটাও নেই। চিন্তিত গলায় সে বলল, ‘গেল কোথায়!’
এরপর এ-বাড়ি সে-বাড়ি, এ-রাস্তা সে-রাস্তা ঘোরাঘুরি করে রাতুলকে কোথাও না পেয়ে মুখ কালো করে বাড়িতে ফিরে এলাম। এসে দেখি, মনি আর রবিনও সাইকেল নিয়ে কলেজ পর্যন্ত খুঁজে এসেছে, পায়নি।
বাড়ির বড়রা পর্যন্ত সাংঘাতিক ভয় পেয়ে গেল। নানাভাই মুক্তা মামা আর তোতা মামাকে থানায় পাঠিয়ে দিয়ে রিকশা চেপে কোথায় যেন বের হয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে ফিসফিস করে বলে গেলেন, ‘পুকুরে জাল ফেলে খুঁজে দেখতে’।
পুুকুরে জাল ফেলতে ফেলতে হাত-টাত লাল
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments