ঢাকার সংগীত-সমাজ
...গান-বাজনার পথটা ঢাকায় তিরিশ দশকেও বড়ো হেয় বলে গণ্য করা হত। কিন্তু সেইসঙ্গে একদিকে স্বদেশি গানের রেয়াজ আর অন্যদিকে ছিল ব্রহ্মসংগীতের প্রচলন। দেশাত্মবোধক নানা গানের প্রচলনের সঙ্গত কারণ ছিল। মুকুন্দ দাসের যাত্রা ঘুরে ফিরে পাড়ায় পাড়ায় চলত। দ্বিজেন্দ্রলালের নাটকের গানগুলোও প্রচলিত হয়েছিল। বিপ্লবী ভূপেন রক্ষিতে পিতা যোগেশ রক্ষিত, রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলালের গান শেখাতেন। তখন বাড়ির মেয়েরা, যারা স্কুলে যেত, তাদের মধ্যে হারমোনিয়াম বাজিয়ে সা রে গা মা সাধার প্রচলন হয়েছে। নিতান্ত ছেলেবেলায় স্কুলের প্রাইজ বিতরণী অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের গান করেছিলাম । সেই থেকে বাড়িতে বাধা সত্ত্বেও গানের টান থেকে গেল। পাড়ায় কিশোরদের থিয়েটারের জন্য দাদার (বিপ্লবী অনিল রায়) ডাক এল। লীলাদির (তখনকার লীলা নাগের) বাড়িতে থিয়েটার। লীলা নাগকে কে না জানত? বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সম্মানিত ছাত্রী। সেই থিয়েটারসূত্রে ঢুকে পড়লাম তরুণ দলে। কুস্তি করা, বই পড়া, শেষ রাতে উঠে মাঠে দৌড়ঝাপ, কুচকাওয়াজ, হাতে লেখা মাসিক পত্রিকা চালান- এসবই হল নিত্যকার রুটিন। এরমধ্যেই চলত গান শেখা, ঘুরে ঘুরে গান করে চাঁদা আদায়, জনসভায় গান—এসব নিয়ে দিন কেটে গেছে। দল বা দলের কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার উপায় ছিল না সেদিন।
বাড়ির কাছাকাছি জগন্নাথ হল। ছেলেবেলা থেকেই আমরা কমনরুমে যাতায়াত করি। পত্রিকা দেখা, বড়োদের সঙ্গে টেবিল টেনিস ও কেরাম খেলার সুযোগ পাওয়া যেত। বড়োরা স্নেহের চোখে দেখতেন। জগন্নাথ হল আর ঢাকা থিয়েটার, বক্তৃতা, সরস্বতী পুজোয় যাত্রা গান আর অন্যান্য উৎসবে কোন না কোনভাবে আমরা ঢুকে পড়তাম। ছেলেবেলায় রবীন্দ্রনাথকে তো এখানেই দেখেছিলাম। মনে পড়ছে, রবীন্দ্রনাথ ঢাকায় আসবেন। সাড়া পড়ে যায় চারদিকে। লাইন করে আমরা—স্কুলের ছেলেরা – সদরঘাটের নর্থব্রুক হলের সামনে দাঁড়িয়ে, নারায়ণগঞ্জ থেকে তিনি আসছেন। এরপর আমরা দৌড়ে গিয়েছিলাম পিনিসবোটের কাছে যেখানে কবির প্রথম থাকবার ব্যবস্থা হয়েছিল। এখানে ছাত্রীরা ও অনেকে সংবর্ধনা করেছিল রবীন্দ্রনাথকে, মেয়ের দলসহ লীলাদিকে দেখেছিলাম মালা পরিয়ে দিতে। সদরঘাটের পার্কে যেখানে মঞ্চ তৈরি হয়েছিল, সেখানে নদীর ওপার থেকে অস্তরবির সোনালি রশ্মি এসে কবির মুখে পড়েছিল। রঙের অজস্র ধারায় রঙিন রবীন্দ্রনাথ অস্তাচলগামী সূর্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যে অপূর্ব বাণী বিস্তার করেছিলেন, আজও হয়ত কারো কারো মনে থাকতে পারে। এরপর রমনা রমেশচন্দ্র মজুমদার মশায়ের কুঠিতে ঘুর ঘুর করে বার বার কবিকে দেখে নিয়েছিলাম। সেদিনের কবি-দর্শন প্রথম প্রেমের মতো সজীব।
সে যুগে ছোরাখেলা, লাঠিখেলা, কুচকাওয়াজ আর অগ্নিদীক্ষার দিন কেটে যাচ্ছিল দ্রুতবেগে। আমাদের মধ্যে দু-একটি ধন্যি ছেলে আগ্নেয় অস্ত্র হাতড়াতো, তাদের মধ্যে ভীষণতম দায়িত্ব নিয়ে কেউবা কিছুদিনের মধ্যেই চলে গেছে জেলে, কেউবা নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। এমনি করেই ১৯২৯ সালের পর থেকে দিনগুলো এসেছিল অগ্নিস্ফূরণ নিয়ে। সতীর্থ, সহপাঠী, ভাই দাদাদের অনেকে বন্দি হতে লাগল। আগুনের খেলায় প্রাণ দিতে এগিয়ে গেল অনেকে। মোটামুটি দুটো বছরের মধ্যে অনেকেই যখন রাজবন্দি, তখন কতকটা পালিয়ে ফিরছি। নেহাৎ ভাল মানুষটি সেজে সংগীতের আশ্রয় নিয়েছিলাম। ১৯৩১ সাল থেকে এস্রাজ যন্ত্রটি অবলম্বন করে সংগীত শেখার শুরু। কতকটা ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ না করলে এ সময়ের কথা লেখা যায় না, কারণ বিষয়বস্তুর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সম্পর্কিত ছিলাম। নানের সঙ্গে তত্ত্ব শেখার চেষ্টা সেই সংগীত শেখার সূত্রে। বীণামন্দির নামে সংগীতযন্ত্রের ছোট একটি দোকানে বসে সংগীতের আড্ডা মন্মথ রায় বা পিলু বাবুকে কেন্দ্র করে। এবারে পুলিশের নেক নজর থেকে মুক্ত হওয়া গেল। পিলুবাবু সিলেট সুনামগঞ্জের জমিদার পরিবারের লোক, যদিও বাড়ি ছিল ঢাকা মানিকগঞ্জে। সুশিক্ষিত সংস্কৃতিসম্পন্ন এই পরিবারের কয়েকজনই অধ্যাপক ছিলেন। পিলুবাবু সেকালের গ্র্যাজুয়েট, প্রথম জীবনেই স্ত্রী বিয়োগের পর থেকে দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহ করেননি। পাড়ায় হোমিওপ্যাথি ওষুধ বিতরণ, যন্ত্র তৈরি দেখাশোনা আর সারাদিন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments