ঢাকার মেলা ও পার্বণ
ঢাকায় সঙ্গীতপ্রিয়তা অতি সাধারণ হয়ে যাবার কারণসমূহ গত বৈঠকে আমি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করেছিলাম। এ থেকে আপনাদের জানা হয়ে গেছে যে, এখানে গান বাদ্যের প্রচলন প্রাচীন যুগ থেকেই রয়েছে এবং এখানকার বাসিন্দারা এ বিষয়ের অনুরাগী। সাধারণ রেওয়াজের এক কারণ সঙ' বের করা এবং এই শখের প্রকাশ বছরে কয়েকবার ঘটত, যেমন চৈত্র-পর্ব। চৈত্র মাসের শেষ দিন অর্থাৎ চৈত্রসংক্রান্তির দিন দুপুর থেকে শুরু করে সন্ধ্যার পর পর্যন্ত মসজিদগঞ্জের চরে এই মেলা বসত। প্রথমত এই চর মোগলানীর চর বলা হতো। অতঃপর কামরাঙ্গীর চর বলা হতো এবং এখন মসজিদগঞ্জের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবার কারণে মসজিদগঞ্জের চর বলা হয়। এটি হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের যৌথ মেলা। এখানে বেশির ভাগ মাটির খেলনা এবং মাটির বাসনপত্রের দোকান বসত। কোথাও সামিয়ানা টাংগানো হতো এবং সঙ্গীতের জলসা জমত, যেখানে শহরের হিন্দু-মুসলমান গায়ক নিজেদের নৈপুণ্য প্রদর্শন করত। কিন্তু বেশির ভাগ সঙই মহল্লা থেকে আসত এবং গান বাদ্য করে সন্তুষ্ট হতো এবং অন্যান্যদেরও আনন্দদান করত।
আমি পূর্বেও নিবেদন করেছি যে, আমাদের শহর দুইভাগে বিভক্ত এবং পূর্ব ও পশ্চিম বলা হতো, কিন্তু যদি খুব গভীরভাবে দেখা হয় তাহলে পূর্ব পশ্চিমের এই সংজ্ঞা যথার্থ নামকরণ এবং একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেয়। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত শহরের পশ্চিম অংশে বেশিরভাগ সেইসব লোক (হিন্দু মুসলিম) বসবাস করে যাদের পূর্ব পুরুষেরা উত্তর ভারত থেকে এসেছে এবং শহরের পূর্বভাগে বেশির ভাগ বাংলার নিজস্ব বাসিন্দাদের অধিবাস। যা হোক পূর্ব পশ্চিম সব ব্যাপারেই একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। এই মেলার সঙদের ব্যাপারে এই পূর্ব পশ্চিমের প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তেজনা (জ্যা) কার্যকর থাকে। এই মেলায় সাধারণভাবে পশ্চিমারা সঙ আনে। এই সঙদের মধ্যে পূর্বওলাদের জন্য আঘাত বা আক্রমণ থাকে। পূর্ব ওলারাও সন্ধানে থাকে যে, পশ্চিমওলারা কী কী করতে যাচ্ছে এবং জওয়াবের প্রস্তুতি তৈরি করতে থাকে। এই মেলার দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ বাংলা সালের প্রথম দিন চিল পূজার' নামে ফরিদাবাদ এবং শ্যামপুরে মেলা বসত। আমার বাল্যকালে আমি দেখেছিলাম যে, ফরিদাবাদ থেকে বেশি বড় মেলা বসত শ্যামপুরে। কিন্তু এখন অবস্থা বিপরীত। যা হোক এতে পশ্চিমের মহল্লাসমূহের সঙদের জবাব দেয়া হতো এবং এতে হিন্দু (বেশি) এবং মুসলমানরা অপেক্ষাকৃত কম অংশ নিত। শ্যামপুরে নাচের জলসা বেশি হতো, যা এখন চোখেই পড়ে না এবং এখন তার জায়গায় জুয়ার প্রাদুর্ভাব বেশি হয়ে গেছে এবং শহরের সব জুয়াড়ি ওখানে পৌঁছে আগামী বছরের ভাগ্য পরখ করে। চৈত্র পর্বকে আমাদের বাল্যকালে চড়ক (চরখ) পূজা বলত। আমি আমার বাল্যকালে চড়ক তো ভাল কথা (দেখি নাই) তার নকল অবশ্যই দেখেছি। কিন্তু এখন চড়ক পূজার নামই শুধু টিকে আছে। অবশ্যই আমি একথা বলতে ভুলে গেছি যে, এই দুই মেলা এমনিতেও সংমিশ্রিত ছিল কেননা এক বাংলা সনের শেষ দিন এবং দ্বিতীয়ত বাংলা সনের প্রথমদিন এবং যারা জানেন তারা অবগত আছেন যে, বাংলা সন আসলে হিজরী সনই; যা চান্দ্র থেকে সৌর করা হয়েছে।
যা হোক এই মেলা এখনও হয় কিন্তু সঙদের নাম নিশানা নেই। সম্ভবত এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেরণাই শেষ হয়ে গেছে অথবা লোকেরা বেশি ভদ্র হয়ে গেছে। এই চৈত্রের শেষ দিন কালী এবং শিব-গৌরীর সঙ বের হতো। এর একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্য যে, কালীর নৃত্যে কালীর দুইহাতে তলোয়ার অথবা রামদা থাকত। এটি একটি বিশেষ নৃত্য ছিল। যাতে আঘাত এবং মারের সমস্ত ভঙ্গি সুন্দর নৃত্যের সাথে প্রকাশ পেতো। প্রত্যেকটি 'সম' (তালের মাত্রা) তরবারীর আঘাতের উপর শেষ হতো। এই নাচের সঙ্গে ঢাক বাজানো হতো। ঢাক বলা হয় বড় বড় ঢোলকে, যা একদিকে বাঁশের তৈরি কাঁচি
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments