রবীন্দ্রনাথ
সুদীর্ঘ ষাটবছর ধরে বাংলাসাহিত্যকে নানা আশীর্বাদে ধন্য করেছেন রবীন্দ্রনাথ। সে দানের কোন হিসেব নেই। জীবনের নানা দিকে তাঁর দান অজস্র ধারায় বর্ষিত হয়েছে। শুধু যে নূতনতর প্রকাশ-ভঙ্গীর সৃষ্টি তাই নয়, মানব চিত্তকেও নূতনতর সমৃদ্ধির দানে পুষ্ট করেছেন তিনি। যে বিরাট মন সমগ্র ভারতবর্ষকে সুদীর্ঘকালের সাধনায় নানা বৈভব বিলিয়ে গেল, তার পরিণতির যে ইতিহাস লোকচক্ষুর অগোচরে তাকে জানবার বাসনা সকলেরই আছে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের বহির্জীবনে যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছিল তার সম্বন্ধে দেশের লোকের ঔৎসুক্য খুব বেশি নয়। তাঁর যে সাধনা তাঁকে মহর্ষি করে তুলেছিল সেই সাধনার কথা দেশ আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। রবীন্দ্রনাথের জীবন দেবেন্দ্রনাথের মত নয়। লোকচক্ষুর অন্তরালে নিজেকে তিনি চিরদিন গোপন করে রাখতে পারেন নি। নানা ঘটনার জটিলতা তাঁকে বার-বার আকর্ষণ করেছে; বহু রাজনৈতিক দুর্যোগে তাঁকে নীরবতা ভঙ্গ করে কথা বলতে হয়েছে; দেশ-বিদেশে নানা সমালোচনার আঘাত সহ্য করতে হয়েছে।
তাঁর ভিতরের জীবনে যেমন নানা বর্ণের নানা ধরণের তরঙ্গের ওঠাপড়া চলেছে বাইরের জীবনেও তার চেয়ে কম তরঙ্গ ওঠেনি। জীবিতাবস্থায় যে খ্যাতি তিনি পেয়েছেন তা অতি অল্প সাহিত্যসেবকের ভাগ্যেই ঘটে। তাঁর ঘরের জীবন আর বাইরের জীবন উভয়ই সমান আগ্রহে জানবার ইচ্ছা আমাদের সকলের।
"অহংটাই পৃথিবীর মধ্যে সকলের চেয়ে বড়ো চোখ। সে স্বয়ং ভগবানের সামগ্রীও নিজের বলিয়া দাবী করিতে কুণ্ঠিত নয়।"
দেবেন্দ্রনাথের জীবনে যে কথাটি সত্য হয়ে ফুটে উঠেছিল তা ঠাকুর-পরিবারের আর সকল স্রষ্টার জীবনেই সত্য হয়েছিল। গায়ত্রীমন্ত্র তাঁরা বংশপরম্পরায় শুধু আবৃত্তিই করেননি, সে মন্ত্রকে জীবনের মন্ত্র করে তুলেছিলেন। উজ্জ্বল অনাবিল প্রাণের স্রোত তাঁদের হৃদয়ে শক্তি দিয়েছে সকল নূতনকে গ্রহণ করার। চোখ মেলে পৃথিবীকে তাঁরা দেখেছেন, তাই তাঁদের রসসাধনা কোন বিকৃতির চোরাগলিতে পথভ্রান্ত হয়ে যায় নি।
বার বার রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে বাড়ীর আবহাওয়াই তাঁকে সকল প্রাচীন অনুশাসনের উদ্যত তর্জনীর সম্বন্ধে নির্ভয় করেছে। শুধু তাই নয়, দাদাদের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েছেন, কোন ভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে বাধা পাননি কোথাও। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ী সেদিন নানা গুণীর মিলনস্থল হয়েছে। এমনি অবস্থায় শিশু রবীন্দ্রনাথ তাঁর চেতনা জাগ্রত করার অবকাশ পেলেন। প্রকৃতি তাঁকে নানা-ভাবে আকর্ষণ করেছে, পিতা তাঁর শিশুচিত্তটিকে উপনিষদের উদার জীবনবন্দনার সুরে বেঁধে দিয়েছেন, দাদারা দিয়েছেন অবাধ স্বাধীনতা। সেই শিশুকাল থেকে কাব্য রচনার প্রথম যুগ পর্যন্ত নানা বিচিত্র ছবি আর সুরে ‘জীবনস্মৃতি’র পাতা ভরা। অতি ছেলেবেলার স্বল্প কথা সাহিত্য হয়ে উঠেছে ‘ছেলেবেলায়’। আর নিজের কবি জীবনের মূল রহস্যটিকে উদঘাটিত করেছেন ‘আত্মপরিচয়ে’। জীবনে যা কিছু লিখেছেন এক অর্থে সবই তাঁর আত্মজীবনী। কিন্তু এই সব লেখা মিলিয়েও বোধ হয় তাঁর পরিচয় শেষ হয় না। সমস্ত বিংশ শতাব্দীর চিন্তাস্রোতের উপর দিয়ে তিনি চলে যান বিরাট তরঙ্গের মতো, মানব-জীবনের নানা ক্ষেত্রে তাঁর সৃষ্টির প্রসাদ পড়ে কিছু কিছু। সে তরঙ্গ এত বিরাট, সে মন এত বিশাল যে মনে হয় এর শেষ পরিচয় কোনদিনই কেউ পাবে না। অবশ্য একথা শুধু রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কেন, সব মহৎস্রষ্টার সম্বন্ধেই ঐ একই কথা। সব জানাবো বললেই সব কথা বলা যায় না। জীবনের রহস্য এত গভীর এত নিবিড় যে কোন ব্যাখ্যাতেই এর শেষ নেই। এত হাসিকান্না, সুখদুঃখের উপর যে জীবন গড়ে ওঠে কতটুকুই বা লেখক পরিবেশন করতে পারেন তার।
আত্মজীবনী রচনায় রবীন্দ্রনাথের আপত্তি ছিল বরাবর। নিজের জীবনী নিজে রচনা করতে তাঁর দ্বিধা কম ছিল না। নিজের ভিতরে যে স্রষ্টা সৃষ্টির মুহূর্তে তাঁকে প্রেরণা যোগান তাঁর কৃতিত্বের ফসল বাইরের সংসারের সাধারণ মানুষটা দাবী করে বসতে পারে এ ভয় সব সময়েই ছিল। এই জন্যেই সাহিত্যপরিষদের অভিনন্দনের উত্তরে বলেছেন “অহংটাই পৃথিবীর
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments