রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানচিন্তা
রবীন্দ্রনাথ তাঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মের দীর্ঘ পথ-পরিক্রমার পর জীবন সায়াহ্নে এসে ‘বিশ্বপরিচয়’ (১৯৩৭) বইতে বিজ্ঞানের নানা জটিল তত্ত্বে অবগাহন করেছিলেন। তাঁর এই দুঃসাহস আপাতদৃষ্টিতে অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হতে পারে। আর এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেও যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। তাই বইটির একটি দীর্ঘ ভূমিকায় দেশের কল্যাণের লক্ষ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানের জ্ঞানকে সহজলভ্য করার অতি জরুরি প্রয়োজনের প্রতি তিনি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন; আর জানিয়েছেন, এ পথে কেউ তেমন এগিয়ে আসছেন না বলেই এক প্রবল দায়িত্ববোধ থেকে তাঁকে এ-কাজে হাত দিতে হয়েছে। তাঁর ভাষায় “আমার দুঃসাহসের দৃষ্টান্তে যদি কোন মনীষী, যিনি একাধারে সাহিত্যরসিক ও বিজ্ঞানী, এই অত্যাবশ্যক কর্তব্যকর্মে নামেন, তাহলে এই চেষ্টা চরিতার্থ হবে।” (বিশ্বপরিচয়, ভূমিকা)
রবীন্দ্রনাথের জীবনকাল (১৮৬১-১৯৪১) বিস্তৃত ছিল আট দশকের ওপরে। এই সুদীর্ঘ জীবনের প্রায় সবটা জুড়েই তিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন বহুবিচিত্র বিপুল সৃষ্টির সম্ভার। তাঁর জীবনের মোটামুটি অর্ধেক কেটেছে উনিশ শতকে, বাকি অর্ধেক বিশ শতকে। কিন্তু তাঁর চিন্তাচেতনায় বিশ শতকের আধুনিক মানুষের রূপ অতি স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে। এর প্রধান কারণ হয়তো এই যে, শৈশবের শিক্ষার অঙ্গ হিসেবেই বিজ্ঞানের প্রকৃতি ও পদ্ধতির সঙ্গে তাঁর একটি নিবিড় আত্মীয়তা গড়ে উঠেছিল। এজন্য তাঁর কাব্যে, গল্প-উপন্যাসে বা অন্যান্য রচনায়, প্রকৃতির বর্ণনায় ও মানব চরিত্র বিশ্লেষণে একজন সুস্থ প্রকৃতি-প্রেমিকের পরিচয় যেমন পাওয়া যায়, তেমনি পাওয়া যায় একটি যুক্তিবাদী বিজ্ঞান-ঘনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ।
জগদীশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের গভীর বিজ্ঞানানুরাগ দেখে বলতেন—‘তুমি যদি কবি না হইতে তো শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক হইতে পারিতে।’
বিজ্ঞানের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়ের কাহিনী তিনি নিজেই নানা প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন। ছেলেবেলায় জোড়াসাঁকোর বাড়িতে তাঁর জন্য নর্মাল স্কুলের শিক্ষা ছাড়াও গৃহশিক্ষকের কাছে যে শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল তার বিস্তার ছিল ব্যাপক গণিত, জ্যামিতি, ইতিহাস, ভূগোল, পদার্থবিদ্যা ও প্রাণিবিদ্যার সাথে চারুপাঠ আর মেঘনাদবধকাব্য সেখানে সহাবস্থান করত। কুস্তি, জিমনাস্টিক্স, ড্রইং, গান-শেখা আর ইংরেজিও বাদ যেত না। তাঁর যখন ন’দশ বছর বয়স তখন রবিবারে “মাঝে মাঝে সীতানাথ দত্ত [ঘোষ] মহাশয় আসিয়া যন্ত্রতন্ত্রযোগে প্রাকৃতবিজ্ঞান শিক্ষা দিতেন। এই শিক্ষাটি আমার কাছে বিশেষ ঔৎসুক্যজনক ছিল। জাল দিবার সময় তাপসংযোগে পাত্রের নিচের জল পাতলা হইয়া উপরে উঠে, উপরের ভারী জল নিচে নামিতে থাকে এবং এইজন্যই জল টগবগ করে, ইহাই যেদিন তিনি কাচপাত্রে জলে কাঠের গুঁড়া দিয়া আগুনে চড়াইয়া প্রত্যক্ষ দেখাইয়া দিলেন, সেদিন মনের মধ্যে যে কিরূপ বিস্ময় অনুভব করিয়াছিলাম তাহা আজও স্পষ্ট মনে আছে।...যে রবিবারে সকালে তিনি না আসিতেন, সে রবিবার আমার কাছে রবিবার বলিয়াই মনে হইত না।” (জীবনস্মৃতি, পৃ. ৪১)
মানবদেহের অঙ্গসংস্থান ও অস্থিবিদ্যা শেখার জন্য সেই শৈশবেই তাঁকে মেডিক্যাল কলেজের শবব্যবচ্ছেদ কক্ষেও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। শৈশবে আমের আঁটি ও আতা-বীচি নিয়ে তিনি যে পরীক্ষা শুরু করেছিলেন তার পরিণতি বৃদ্ধ বয়সে কৃষি সম্পর্কে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষাতে প্রকাশ পায় ।
রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনে অর্থাৎ উনিশ শতকের শেষভাগে দুনিয়াজোড়া বিজ্ঞানের জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল। ইউরোপে যে বিজ্ঞানের বিপুল বিকাশ আর শিল্প-বিপ্লব ঘটছিল তার ঢেউ এসে লেগেছিল পরাধীন ভারতেও। উনিশ শতকের শুরুতেই স্টিম ইঞ্জিনের ব্যাপক ব্যবহার যন্ত্রসভ্যতার দ্রুত বিকাশ ঘটাতে শুরু করেছে, মানুষের চিন্তার ক্ষেত্রেও এনেছে বিপুল আলোড়ন। এই শতকের মাঝমাঝি রবীন্দ্রনাথের জন্মের ঠিক আগে ডারউইনের অভিব্যক্তিবাদ জীববিদ্যার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। প্রায় একই সময়ে রসায়ন— বিদ্যার ব্যাপক বিকাশ, বিদ্যুৎশক্তির ব্যবহার, জীবাণুতত্ত্ব প্রভৃতি মানুষের জীবনযাত্রায় রূপান্তর ঘটাতে শুরু করেছে। বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রার সাথে এদেশে শৈশবের শিক্ষায় তাঁর যেমন পরিচয় ঘটেছিল, তেমনি আরো গভীর পরিচয় ঘটে অল্প বয়সে ইউরোপ বাসের সুযোগ হওয়ায়।
উনিশ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments