পাশা সেদভের উত্তরাধিকার

পাইওনিয়ার শিবিরের ব্র্যাস ব্যাণ্ড বাজিয়েদের মধ্যে পাশা সেদভ ছিল সবার ছোটো। কিন্তু তার ড্রামটি ছিল প্রকাণ্ড। এমনকি যে রামশিঙাটা তার পেতলের অজগর পাকে ঢ্যাঙা কারাভায়েভ’কে জড়াত, সেটাও হার মানত ড্রামের কাছে। কাঁধে তারপলিনের স্ট্র্যাপ গলিয়ে আশা ঝুলিয়ে নিতে ভারি ড্রামটা, ভারসাম্য রাখার জন্যে সামান্য পেছনে হেলতে হত তাকে। হাতে তার থাকত বিস্ময়চিহ্নের মতো হালকা সরু কাঠি নয়, ফেল্ট-মোড়া বাঁটুল লাগানো রীতিমতো বাজন-ডাণ্ডা। তা দিয়ে পাশা নিপূণ বোল তুলত, প্রকাণ্ড যন্ত্রটা দিয়ে তান ধরত ট্রাম্পেটের সঙ্গে। যে জানে না, তার কাছে মনে হবে ড্রাম বাজাতে সবাই পারে। একেবারে ভুল কথা! যে-স্বরলিপি দেখে পাশা বাজাতে তাতে লেখা ছিল: ‘ড্রামের পালা’। গোটা ব্যাণ্ডই চলত তার তালে তালে।

ড্রামটা পুরনো, রঙচটা, তোবড়ানো, মস্তো একটা কালচে তালিমারা। তার ধাতব পাতে সাবেকী ধাঁচের, আধো-মুছে যাওয়া হরফে লেখা ছিল ‘বজ্র ঝাঁপে, দুনিয়া কাঁপে!’ নিশ্চয় অদ্ভুত এই নীতিবাণীটায় বোঝাতে চাওয়া হয়েছে যে ড্রামের প্রাণটা বজ্রের।

হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেল পাশার ড্রাম।

সাধারণত তা টাঙানো থাকত পাশার খাটের শিয়রে। দেয়ালে পোঁতা একটা মজবুত পেরেক থেকে। সবাই ঠাট্টা করত পাশাকে: ‘দেখিস, খসে মাথায় না পড়ে!’

পাশা জানত যে পড়বে না। যখন বৃষ্টি নামত, বাজ ডেকে উঠত জানলার ওপাশে, ড্রাম তখন তাতে সাড়া দিত চাপা গুঞ্জন তুলে। রাত্রে ওটাকে দেখাত যেন ঝিকিমিকি চাঁদ, কেমন করে যেন তা নেমে এসেছে চতুর্থ দলের শোবার ঘরে, আটকে গেছে পাশা সেদভের শিয়রে।

রিহার্সালে যাবার সময় পাশা টুলে চেপে কুঁথে কুঁথে ড্রামটা নামাত দেয়াল থেকে। সাবধানে এগুত যাতে খাটের বাজুর সঙ্গে ওটার ধাক্কা না লাগে। কোনো দিন দেরি হয়ে গেলে যখন ছুটতে হত, তখন ড্রামের ভার পাশাকে ঠেলে সরিয়ে চেয়ে খাটো বলে নয়—স্রেফ এই জন্যে যে ড্রামের জায়গাটা সবার পেছনে, আর ট্রাম্পেটগুলো থাকার কথা সামনে, যদিও কোনো একটা ট্রাম্পেট, এমনকি সবকটা ট্রাম্পেট একসঙ্গে মিলেও চাপা দিতে পারত না ড্রামের ঢিপ স্পন্দন, তার জোরালো দরাজ বজ্রনাদ। বজ্র ঝাঁপে, দুনিয়া কাঁপে! ড্যাং! ড্যাং! কদমে কদমে তাল দিত ড্রাম, ড্রাম-বাজিয়েকে কিন্তু দেখা যেত না। দূর থেকে মনে হত, প্রকাণ্ড ড্রামটা যেন জীর্ণ জুতো পরা ছাল-ছড়ে-যাওয়া হাঁটু সমতে দুই পায়ে নিজেই হেঁটে যাচ্ছে...

কোথায় গেল ড্রামটা? দুপুরের খাওয়ার আগে পর্যন্ত ড্রামটা দিব্যি ঝুলে ছিল দেয়ালে, কিন্তু চতুর্থ দল যখন খাওয় সেরে ফিরল, তখন আর ওটাকে দেখা গেল না। উঁচিয়ে ছিল শুধু পেরেকটা। সঙ্গে সঙ্গেই সেটা নজরে পড়ে পাশার। তৎক্ষণাৎ সে খুঁজে দেখলে গোটা ঘরটা, উঁকি দিলে প্রতিটি খাটের নিচে, বার কয়েক গোটা বাড়িটাও ঘুরে এল। এ তো আর খড়ের গাদায় সুঁই হারানো নয়—ড্রামের মতো একটা জিনিস।

পাশা ওপা সঙ্গে করে এনেছিল অনেক দূর থেকে। পাইওনিয়র শিবিরে এসে জায়গা মেলে নি। ফলে নিজের বাঙ্কের ওপরেই রেখে তাকে শুতে হয়েছিল বাকি জায়গাটুকুতে। ঘুমিয়েছেও সে ওইভাবে গুটিসুটি মেরে। গোটা পথটা সে বাঙ্ক ভাগাভাগি করে গেছে তার ড্রামটার সঙ্গে।

‘লাগেজ-ওয়াগনে দিলেই পারতিস,’ বলেছিল প্যাসেঞ্জাররা।

লাগেজ-ওয়াগন! বলে দেওয়া তো খুবই সোজা। আর যদি তা হাত থেকে পড়ে যায়, কিংবা মালপত্তর চাপিয়ে দেওয় তার ওপর, থেবড়ে যায়? না বাপু, খুব হয়েছে! এ তো আর লটবহর ভরা ট্রাঙ্ক নয়, ব্যাণ্ডের যন্ত্র।

আর দেখুন, খোয়া গেল যন্ত্রটা।

সারা দিন পাশা খুঁড়ে বেড়ালে গোটা। শিবিরটাই সে ঘুরলে। উঁকি দিলে সবকটি আড়ালে-আবডালে। জিজ্ঞেসা করলে সবাইকে: ‘আচ্ছা, ড্রামটা দেখেছেন কোথাও?’

সবাই কাঁধ ঝাঁকালে। কেউ দেখে নি।

তাদের দলটা রাতের খাবার খেতে গেল, পাশা গেল না। বললে: ‘ড্রামটা না পাওয়া পর্যন্ত খাব

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice