প্রয়োগের নিরিখে : পরশুরাম আর বাখতিন
মিখাইল খাইল বাখতিন (১৮৯৫-১৯৭৫)-এর নাম বাঙালি পাঠক-পাঠিকার অচেনা নয়। তাঁর বেশ কিছু বই ও লম্বা প্রবন্ধ রুশ থেকে ইংরিজিতে অনুবাদ হয়েছে (এখনও অবধি বাঙালির কাছে ইংরিজিই জগতের জানালা)। গত কয়েক বছরে তাঁকে নিয়ে বাঙলাতেও ছোটো-বড়ো বই, পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা ইত্যাদি বেরিয়েছে।
যাঁদের নিয়ে বাখতিন লিখেছিলেন—ফিওদর দস্তয়েভস্কি ও অন্যান্য ইওরোপীয় লেখক—তাঁদের কেউ কেউ আমাদের চেনা, কিন্তু ভালোমতো জানা নন। এমনকি ফরাসি বা রুশ সাহিত্য নিয়ে যাঁরা নিয়মিত চর্চা করেন, মূলেই পড়ে থাকেন, তাঁদের সকলেই যে ঐসব লেখকের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ—এমনও বলা যায় না। এছাড়া ধ্রুপদী ও মধ্যযুগীয় লাতিন কাব্যও বাখতিন-এর আলোচনায় আসে। সে তো আরও অকূল পাথার। ইংরিজি তর্জমায় একবার বা দুবার এঁদের কিছু রচনা হয়তো অনেকেরই পড়া। কিন্তু তার ভিত্তিতে কোনো সমালোচনার মূল যাচাই করা যায় না। (কোনো কোনো পণ্ডিত দেখি অকুতোভয়ে তা-ও করেন!)
তবে বিবরণতত্ত্ব, narratology-র সঙ্গে যুক্ত একটি বিষয়, যে-কোনো ভাষার সাহিত্যপাঠকের পক্ষে বিচার করা সম্ভব। সেটি হলো বাখতিন-এর বহুস্বর (polyphony)-তত্ত্ব।[১]গল্পে-উপন্যাসে অনেক চরিত্র আসে, তাদের মধ্যে নানা মত-অমত দেখা যায়। বাখতিন চান: প্রতিটি চরিত্রই তার নিজের মতো কথা বলুক, কোনো চরিত্রর ভেতর দিয়েই যেন লেখকের ভাবনা ফুটে না বেরয়। এরই দৃষ্টান্ত হিসেবে এসেছেন দস্তয়েভস্কি, যিনি এই রীতির সার্থক রূপকার। তাঁর চরিত্ররা স্রষ্টার নিজের ছাঁচে ঢালা নয়।
এর ঠিক উল্টো পিঠে থাকেন তলস্তয়। বাখতিন মনে করেন তাঁর গল্পে-উপন্যাসে সবার গলা ছাপিয়ে একটি গলাই শোনা যায়। সেটি লেখকের নিজের। দস্তয়েভস্কি সে-দিক দিয়ে আদর্শ হরবোলা।
বাখতিন যে বহুস্বর-এর কথা বলেছেন, তা মূলত কথাসাহিত্যর ক্ষেত্রে। নাটকে তো লেখকের সশরীরে হাজির হওয়ার সুযোগ থাকে না। সেখানে প্রতিটি চরিত্রই নিজের স্বভাব ও পরিস্থিতি অনুযায়ী কথা বলবে—এমনই আশা করা যায়। গল্প-উপন্যাসের লেখক কিন্তু ইচ্ছে করলেই নিজের মতামত জানাতে পারেন—নিজের কথায় বা কোনো চরিত্রের মুখ দিয়ে।
তবু নাটকের ক্ষেত্রেও একম্বর-বহুস্বর-এর তফাত করা যায়। শেক্সপিয়র-কে যদি বহুস্বর-এর শিল্পী বলে ধরা হয় (চের্নিশেস্কি তেমনই ধরেছিলেন—বাখতিনও বারবার তাঁর কথা তোলেন),[২]বার্নার্ড শ-কে ধরা যায় একম্বর-এর প্রবক্তা বলে (শ-এর কথা অবশ্য এ প্রসঙ্গে বাখতিন একবারও বলেননি)। তাঁর নাটকে প্রায়ই একটি চরিত্র থাকে যার বকলমে শ তাঁর নিজের মত প্রচার করেন, নিজেরই পছন্দ-অপছন্দ জানান।
কথাগুলো নতুন নয়, শেক্সপিয়র-এর ক্ষেত্রে কিট্স-ও লক্ষ করেছিলেন এক নঞর্থক ক্ষমতা (negative capability)। একই সঙ্গে খলনায়ক ইআগো আর সচ্চরিত্রতার প্রতিমূর্তি ইমোজেন-কে তিনি হাজির করতেন সমান বিষয়নিষ্ঠ (objective) ভাবে, নিজে তাদের কোনোটাই না-হয়ে।[৩]
লেখকের নিজের মতামত যত চাপা থাকে ততই ভালো, ঘটনা ও পরিস্থিতি থেকেই সেগুলো বেরিয়ে আসুক—এমনই চেয়েছিলেন ফ্রেডরিক এঙ্গেলস।[৪]নাটকের মতো উপন্যাসেও যে বহুস্বর থাকে, তার সবকটিই যে লেখকের নিজের নয়—এ তো স্বতঃসিদ্ধ। প্রশ্ন হলো: লেখকের গলা না-শুনতে পাওয়াই কি কথাসাহিত্যর সবচেয়ে বড় গুণ, বা তার বিচারের প্রথম/প্রধান শর্ত?
এই প্রশ্নটিই আমরা পরখ করে দেখতে চাই অন্য এক লেখকের ক্ষেত্রে। বাখতিন জীবনে তাঁর নামও শোনেন নি। তিনি পরশুরাম (১৮৮০-১৯৬০)। যাঁরা মনে করেন তত্ত্বর মূল্য তত্ত্ব হিসেবেই, প্রয়োগের ক্ষেত্রে তা মিলল কিনা সে-খবর না-জানলেও চলে, তাঁরা যদি এই আলোচনাটি আর না-পড়েন তাহলে অখুশি হব না। একটা তত্ত্ব খাড়া করা হচ্ছে, তার সপক্ষে দু-একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু তার বাইরে তত্ত্বটি আর কোথাও খাটে কিনা—সেটাও তো যাচাই করা চাই। যদি এমন হয় যে, অন্যান্য লেখকের বেলায়ও তত্ত্বটি খাপ খাচ্ছে, তবেই বলা যায়: হ্যাঁ, তত্ত্বটির মধ্যে অন্তত কিছু সারবস্তু আছে।
পরশুরামের গল্পর ক্ষেত্রে বহুস্বর-তত্ত্ব নিয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে বাখতিন সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা কাটানো দরকার।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments