রবীন্দ্রগ্রন্থস্বত্ব-ভোগ
লেখক: উজ্জ্বলকুমার মজুমদার
শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্ররচনার গ্রন্থস্বত্বের মেয়াদ অর্ডিন্যান্স্ জারি করে আরো দশ বছর বাড়িয়ে দেওয়া হলো। এবং এই অর্ডিন্যান্সে রাষ্ট্রপরি স্বাক্ষর করলেন একেবারে মেয়াদ শেষ হবার তিনদিন আগে।
গত প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে রবীন্দ্রগ্রন্থস্বত্ব নিয়ে নানা তর্ক-বিতর্ক চলেছে। বিশ্বভারতীর কর্তৃপক্ষও সভা ডেকে গ্রন্থস্বত্ব নিয়ে নানাজনের মতামত শুনেছেন, নিজেদের মতামত দিয়েছেন। কিন্তু তারও অনেক আগে থেকে, অন্তত পাঁচ-ছ বছর আগে থেকে, বিশ্বভারতীর কর্তৃপক্ষ রবীন্দ্রগ্রন্থস্বত্ব যাতে বিশ্বভারতীরই থাকে সে নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। গ্রন্থস্বত্বের আইনকানুন নিয়েও তাঁরা ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন এবং স্বত্বের মেয়াদ বৃদ্ধির সমর্থনে কিছু কিছু দেশের নিজস্ব আইনকানুন সম্পর্কেও খোঁজখবর নিয়েছেন। অন্যদিকে, চেষ্টা চরিত্র স্বত্ত্বেও অনিশ্চয়তা থেকে যাওয়ায় সুলভে রবীন্দ্ররচনাবলি প্রকাশনার ব্যবস্থা করেছেন এবং কিছু কিছু সংকলনও প্রকাশ করেছেন যেগুলি পাঠকদের আকর্ষণ করতে পারে। রবীন্দ্রকাব্যের সংকলন ‘সূর্যাবর্ত’, এবং শিশু-কিশোরদের রবীন্দ্ররচনার সংকলন ‘কৈশোরক’ এই জাতীয় উল্লেখযোগ্য সংকলন। গ্রন্থস্বত্ব থাক আর নাই থাক, এই জাতীয় শোভন সংকলন সব সময়েই অভিনন্দনযোগ্য। কেননা নতুন যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রবীন্দ্ররচনার নানা জাতের নানা দৃষ্টিভঙ্গির সংকলন খুবই প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছিল এবং বিশ্বভারতীর কর্তৃপক্ষ যে এব্যাপারে কিছুটা সচেতন হয়েছিলেন তা ভাবতে ভালোই লাগে। কিন্তু সুলভ রচনাবলি ও নানা ধরনের সংকলন প্রকাশে বিশ্বভারতীর এই উদ্বেগের কারণ অবশ্যই বোঝা যায়। আগেই বলেছি, সে কারণ মেয়াদ বৃদ্ধি সম্পর্কে অনিশ্চয়তা।
যেহেতু রবীন্দ্রনাথ তাঁর গ্রন্থস্বত্ব বিশ্বভারতীকেই দিয়ে গেছেন অতএব গ্রন্থস্বত্ব বিশ্বভারতীরই থাকা উচিত, এই যুক্তি বিশ্বভারতীর কর্তৃপক্ষ দিয়েছেন। যে প্রচণ্ড দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ এই প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ও প্রশাসনিক বাধাগুলি মেটাবার চেষ্টা করে গেছেন এবং প্রতি মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ ভেবে আতঙ্কিত হয়েছেন সেই পরিপ্রেক্ষিতেই নিজের গ্রন্থস্বত্ব বিশ্বভারতীকে দিয়ে গেছেন। কাজেই খানিকটা আর্থিক সমস্যা মিটবে এই আশাতেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর প্রায় বছর দশেক বাদে যখন কেন্দ্রীয় সরকার বিশ্বভারতীর ভার নিলেন তখন বিশ্বভারতীর অন্যসমস্ত সমস্যার মতোই আর্থিক দয়িত্বটাও তাঁদেরই ওপর বর্তেছে। কিন্তু তারপর বছর চল্লিশেক কেটে গেছে। কেন্দ্রীয় সরকার বিশ্বভারতীর প্রতি যথোচিত সুবিচার করেছেন বলে মনে হয় না। অন্য সব কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে তুলনা করেই একথা বলছি। আজ যদি রবীন্দ্ররচনার গ্রন্থস্বত্ব শেষ হয়ে যাবার মধ্যে বিশ্বভারতীর আর্থিক ঘাটতি ঘটতে থাকে সে তো তাঁদেরই দায়িত্ব। এখন দেশ যে আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে তাতে অবশ্য বিশেষ করে বিশ্বভারতীর জন্যে তাঁরা ভাবনা-চিন্তা ও প্রয়োজনীয় সাহায্য করবেন বলে তো মনে হয় না। যখন এই আর্থিক সংকট ছিল না তখনও কেন্দ্রীয় সরকার আহামরি কিছু করেন নি। তাছাড়া রাজনৈতিক ও বিভিন্ন সংকীর্ণতার মধ্যে বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে বিশ্বভারতীর প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া কতটা সম্ভব তা জানি না। কিন্তু দায়িত্ব যে তাঁদেরই এবিষয়ে সন্দেহ নেই। গ্রন্থস্বত্ব চলে গেলে রবীন্দ্ররচনা থেকে প্রকাশনা বিভাগের কথামতো পাঁচ-ছ লাখ টাকার রয়্যালটিতে ঘাটতি পড়তো। ঠিক কতো ঘাটতি পড়তো তা বলা মুশকিল। যাই হোক, টাকাটা এমন কিছু ভয়াবহ নয়। এমনকি পুরো রয়্যালটির টাকাটাও এমন কিছু নয়। এই আর্থিক সংকটেও অপরিমিত টাকা-পয়সা অবাঞ্ছিতভাবেই নষ্ট হচ্ছে। এবং লাখের বদলে কোটি দিয়ে তার মাপ করাই ভালো। সেক্ষেত্রে বিশ্বভারতীর ওপর রবীন্দ্রগ্রন্থস্বত্বের ভারের মেয়াদ কিছুদিন বাড়িয়ে এই সামান্য কয়েক লাখ টাকার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে—এ ধারণাটা খুব হাস্যকর। বিশ্বভারতী বা কেন্দ্রীয় সরকার—যে দিক থেকেই এমন যুক্তি আসুক তা মেনে নেওয়া যায় না।
কেউ বলতে পারেন, এবং বলেছেনও, না, আর্থিক ব্যাপারটা একেবারেই গৌণ। আসলে সুলভ, বিশুদ্ধ ও সমগ্র রবীন্দ্রনাথকে একমাত্র বিশ্বভারতীই পৌঁছে দিতে পারে এবং রবীন্দ্রনাথের রচনার বিশুদ্ধতার রক্ষার কাজ বিশেষ করে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
আকর্ষণীয় মূল্য
এক বছর
এক মাস
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে
সাবস্ক্রাইব করেছেন? আপনার একাউন্টে লগইন করুন
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments