ঢাকায় রমজানের আগমন
শবেবরাতের পরেই প্রত্যেক জায়গায় পবিত্র রমজানের আগমন হয়েছে বলে মনে করা হতো এবং বিশ তারিখের পর সব ধরনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ততা পরিলক্ষিত হতো। আলহামদুলিল্লাহ্! শহরে মসজিদের সংখ্যা অনেক বেশি এবং মাশাআল্লাহ, অধিকাংশগুলিতেই নামাজ পড়া হয়। মসজিদের চুনকাম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং ধনীদের বাড়িতে রাজমিস্ত্রি এবং মজুরদের আগমন রমজান শরিফের প্রকাশ্য পূর্বাভাস ছিল। গরিব লোকেরাও রমজানের চাঁদের পূর্বে নিজেদের ঘর স্বচ্ছ মাটি দিয়ে মুছে লেপে ঝক ঝকে তক তকে বানিয়ে ফেলত। প্রত্যেক বাড়িই ক্ষমতা অনুসারে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা করত এবং করাতো। ঘোড়োঞ্চি'বা জলকান্দা পর্যন্ত পরিষ্কার করা হতো। নতুন ঘড়া, মাটির নতুন হুক্কা, নতুন নৈচা ইত্যাদি আনা হতো এবং সুরভিত করে নেয়া হতো। তামাকের বিশেষ বন্দোবস্ত করা হতো। বালি মাটির তৈরি নতুন সুরাহী আনান হতো। 'তমে রায়হান (তোকমা ইত্যাদি), বালুংগু' এবং গোলাপ, কেওড়া ক্ষমতায় যতটুকু কুলাত এনে রাখা হতো। ছোলা এসে যেতো এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখা হতো। সাতাশ সাবান নতুন হাড়িতে মুগ ভিজানো হতো যেন পহেলা রোজায় তার অংকুর বের হয়ে যায় এবং তা ইফতারে ব্যবহার করা যায়। চাঁদ রাতেই প্রত্যেক ঘরে বিছানাপত্রের ব্যবস্থা হয়ে যেত। চুন প্রথম থেকেই দই এর মধ্যে ঠাণ্ডা করে নেয়া হতো, জনকপুরী খয়ের গোলানো এবং ছানা হতো। অতঃপর কেওড়ার ফুলের পাপড়িতে রেখে সুবাসিত করা হতো। ছেলেদের সাজি মাটি, খৈল এবং বেসন দিয়ে গোসল করান হতো। অতঃপর চাঁদ দেখার প্রস্তুতি চলত। বড় কাটরা, আহসান মঞ্জিল, হোসেনী দালান, ছোট কাটরার উঁচু ইমারতের ছাদের উপর লোক সময়ের অনেক আগেই পৌঁছে যেত এবং অধিক উৎসাহীরা নৌকা সহযোগে নদীর মাঝখানে যেয়ে চাঁদ দেখত। বালক এবং যুবা সকলেই যেত, বিশেষত বৃদ্ধরা তাঁদের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষার জন্য অবশ্যই পৌঁছাত। অতঃপর এই চেষ্টা চলত যে, আমি সর্বপ্রথম চাঁদ দেখব। নীল আকাশে অবশেষে চাঁদ দেখা গেল। খুশির একটা হল্লা (হৈ চৈ) উঠল এবং একে অপরকে মোবারকবাদ দেওয়া শুরু করল। পটকা, বন্দুক ও তোপধ্বনি চলল এবং এমন আওয়াজ হলো যে, যারা কানে শোনে না তারাও শুনে নিল যে চাঁদ উঠে গেছে। ছোটরা বড়দের কাছে সালাম করার জন্য উপস্থিত হয়ে দুআ নিয়ে ফিরে এলো। মসজিদে হাফেজ সাহেব প্রথম থেকেই ঠিক করা হয়ে গিয়েছিল, ঝাড়-ফানুস পরিষ্কার করে মোমবাতি লাগান হয়ে গেছে। আজ তারাবি (নামায) কিছুটা দেরীতে শুরু হবে, যেন মুসল্লিরা সবাই মিলে পরামর্শ করতে পারে যে, কটায় নামায শরু করা হবে, উদ্দেশ্য যেন লোকদের সুবিধা হয়। বাজারের মসজিদসমূহে একটু আগে এবং মহল্লার মসজিদসমূহে একটু দেরী করে নামাজ শুরু হতো। আমাদের ছোটবেলায় সূরা তারাবির রেওয়াজ বেশি ছিল এবং খতম তারাবির সংখ্যা কম। কারণ, শহরে হাফেজদের সংখ্যা বেশি ছিল না। এখানে হাফেজ কারী আবদুল মান্নান, হাফেজ মহীউদ্দীন, হাফেজ মোঃ ইউসুফ, হাফেজ মাওলা বখশ এবং অন্য স্থান থেকে এসে যারা অধিবাস গ্রহণ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে হাফেজ কারী পীর বঙ্গ লাখনুবী এবং হাফেজ ফয়েজ আহম্মদ প্রসিদ্ধ ছিলেন। আমার সামনেই হাফেজ হাবিবুর রহমান, হাফেজ উবায়দুল্লাহ, হাফেজ আবদুল লতিফ হাফেজ হন। বাইরের হাফেজও অনেক আসতেন, তাঁদের খুবই মর্যাদা ও সমাদর করা হতো। তাঁদের মধ্যে হাফেজ 'রেল', হাফেজ 'তুফান', এবং হাফেজ 'আমামন' খুবই প্রসিদ্ধ ছিলেন। এখন তো মাশাল্লাহ প্রত্যেক মহল্লায় হাফেজ তৈরি হয়ে গেছে এবং একটা কেন তিন তিনটা কোরান শিক্ষার মাদ্রাসাহ রয়েছে। এদিকে লোকেরা তারাবির জন্য মসজিদে গেছেন। সেহরির জন্য আয়োজন করে শোয়ার ব্যবস্থা হলো। শিশুরা সেহরির সময় ডাকার জন্য নাছোড়বান্দা হয়ে অঙ্গীকার নিল, তারাবির পর পুরুষেরা বাড়িতে এসে শুয়ে পড়ত এবং যুবকেরা গল্প-সল্পে মত্ত হয়ে সেহরি পর্যন্ত জেগে থাকার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments