শরতের এক সন্ধ্যায়
শরতের এক সন্ধ্যায় একবার খুবই অসুবিধাজনক আর অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিলাম। সদ্য এক শহরে পৌঁছে দেখি একেবারে কপর্দকহীন অবস্থা, মাথা গোঁজার একটা আস্তানা পর্যন্ত নেই, সেখানের একটা লোককেও চিনি না।
গোড়ার ক’দিন অতিরিক্ত জামাকাপড় যা কিছু সঙ্গে ছিল সব বিক্রি করে দিলাম; শহর ছেড়ে চলে গেলাম উসতাই-এর শহরতলিতে—পারঘাটগুলো সব সেখানেই।
নৌকো চলাচল মরসুমে কর্মব্যস্ততায় জায়গাটা সরগরম হয়ে থাকে—কিন্তু তখন একেবারে নিস্তব্ধ, জনমানব শূন্য—অক্টোবর মাস প্রায় শেষ হয় হয়।
ভেজা বালুর ওপর দিয়ে পা টেনে টেনে চলতে চলতে বালুর ওপরে লক্ষ্য রাখছিলাম, খাবারের ছিটেফোঁটাও যদি মেলে এই আশায়, খালি বাড়ি আর দোকান ঘরগুলোর মধ্যে দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে ভাবছিলাম ভরাপেট কী রকম সুখদায়ক।
আমাদের সংস্কৃতির বর্তমান অবস্থায় শরীরের ক্ষুধার থেকে মনের ক্ষুধা মেটানো অনেক সহজসাধ্য। রাস্তাগুলোর মধ্যে দিয়ে ঘোরবার সময় চোখে পড়বে, চারপাশের মনোরম সব অট্টালিকা—বাইরের দিক থেকে তো বটেই, সেগুলোর ভিতরও যে সমানভাবেই মনোরম এ সম্বন্ধে মোটামুটিভাবে নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে। এসব দেখেই হয়তো মনের মধ্যে শুরু হয়ে যাবে সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান এবং অন্য ধরনের মহত্তম সব প্রসঙ্গ সম্বন্ধে এক সুখকর চিন্তাধারা। উপযুক্ত গরম পোশাকে সজ্জিত নানা লোকজন চোখে পড়বে—তারা সব সভ্য, ভদ্র, তারা তোমাকে পথ ছেড়ে দেবে, তোমার অস্তিত্বের মত দুঃখজনক ঘটনাকে তারা অগ্রাহ্য করাই শ্রেয় মনে করে। সত্যি বলতে কি, দুবেলা ভালো করে পেট ভরে খেতে পায় এমন লোকের মনের থেকে একজন ক্ষুধার্ত লোকের মন অনেক বেশি পরিপুষ্ট, এই তথ্য থেকে ভরাপেট খাবারে অভ্যস্ত লোকেদের অনুকূলে বেশ কৌতুকজনক এক সিদ্ধান্তে আসা যায়!..
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল, বৃষ্টি পড়ছিল—উত্তর দিক থেকে বয়ে আসছিল দমকা একটা বাতাস। খালি দোকানঘর আর স্টলগুলোর মধ্যে দিয়ে সোঁ সোঁ শব্দে বাতাস বয়ে গিয়ে কাঠের তক্তা মেরে বন্ধকরা সরাইখানার জানালাগুলোর ওপর দমাদম বাড়ি মারছিল, বাতাসের বাড়ি লেগে নদীর জল ফেনিয়ে উঠছিল, ঢেউগুলো সশব্দ বালুকাময় তটের ওপর আছড়ে পড়ছিল, তাদের সাদা সাদা চূড়ো ঝাঁকিয়ে একে অন্যের ওপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন সুদূরের দিকে ধেয়ে চলেছিল। মনে হচ্ছিল নদী যেন শীতের আগমনের আভাস পেয়ে বরফের শিকলের ভয়ে পালাচ্ছে। বরফের শিকল দিয়ে উত্তরে বাতাস হয়তো সেই রাতেই তাকে বেঁধে ফেলতে পারে। ভারাক্রান্ত আকাশ যেন নিচে নেমে এসেছে, একভাবে একনাগাড়ে ঝির ঝির বৃষ্টি ঝরিয়ে চলেছে সে। ভেঙেপড়া বিকলাঙ্গ দুটো উইলো গাছ আর উপুড় হয়ে পড়ে থাকা উলটানো এক নৌকা আমার চার পাশে প্রকৃতির শোক-গাথার বিষণ্ণতা যেন আরো বাড়িয়ে তুলেছিল।
তলা ভাঙা নৌকো, ঠাণ্ডা বাতাসে বিপর্যস্ত করুণ, বুড়ো দুটো গাছ...সব কিছু যেন বিধ্বস্ত, বন্ধ্যা, মৃত আর অবিশ্রান্ত অশ্রুবর্ষণ করে চলেছে আকাশ। আমার চারপাশে শুধু অন্ধকারাচ্ছন্ন জনমানব শূন্য এলাকা। মনে হচ্ছিল এই মৃত্যুর মাঝখানে আমি যেন একমাত্র জীবন্ত বস্তু, এই হিমশীতল মৃত্যু যেন আমার জন্য ও প্রতীক্ষা করে রয়েছে।
আর তখন আমার বয়স মাত্র সতেরো বছর—কী চমংকার সেই বয়স!
ঠাণ্ডা ভেজা বালুর ওপর দিয়ে চলতে লাগলাম, ঠাণ্ডা আর ক্ষুধার সম্মানে দাঁতে দাঁত ঠুকে তাল দিতে দিতে। খাবারের খোঁজে ব্যর্থ সন্ধান করতে করতে হঠাৎ একটা স্টলের পাশ দিয়ে গিয়ে মোড় ফিরতেই চোখ পড়লো মেয়েলি পোশাক পরা গুটিশুটি মেরে বসে থাকা এক মূর্তির ওপর, বৃষ্টিতে ভেজা পোশাক তার নোয়ানো কাঁধে লেপটে রয়েছে। কাছে গিয়ে দেখবার চেষ্টা করলাম কি করছে সে। দেখলাম হাত দিয়ে বালি খুঁড়ে সে একটা স্টলের নিচে ঢোকবার চেষ্টা করছে।
“আরে, ওকি করছো?” গুঁড়ি মেরে তার পাশে বসে পড়ে জিজ্ঞাসা করলাম।
মৃদু চিৎকার করে সে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো। এখন যখন সে উঠে দাঁড়িয়ে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments