উৎসব
এমন আশ্চর্য ব্যাপার আর দেখি নাই, লোকটা সরবে রোদন করিতে লাগিল,—ভেউ ভেউ ভেউ! কান্নার কয়েকটি নামই জানি, জীবনের এতগুলি বছর ধরাপৃষ্ঠে অবস্থান করিয়া কান্না সম্বন্ধে অনেক অভিজ্ঞতাই লাভ করিয়াছি, কিন্তু এটি কোন্ জাতীয়, তাহাই ভাবিতে লাগিলাম। অথচ পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্বন্ধে অচেতন হইয়া এখন কোনো ভাবনাই যে ভাবা উচিত নয়, এই তথ্যটি অতি সহজেই ভুলিয়া যাওয়ায় সহজেই বাধাপ্রাপ্ত হইলাম। চিন্তার সূত্র ধরিয়া বেশি দূর অগ্রসর হয় নাই, হঠাৎ একটা প্রকাণ্ড দীর্ঘনিশ্বাসযুক্ত ফোঁপানির শব্দে সভয়ে মুখ তুলিয়া দেখি, কান্নার পর্ব সশব্দে সমাপ্ত করিয়া লোকটা এবার ফুঁপাইতেছে এবং জামার আস্তিনে চোখ মুছিতেছে।
তাড়াতাড়ি বলিলাম, দেখুন এমন করে কাঁদবেন না, ও দেখে আমারও যে ভারি কান্না পায়। ছোটোবেলায় ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্রই মা হারিয়ে কত কেঁদেছি, বড়ো হয়ে পরীক্ষায় পাশ করে কেঁদেছি, আর বিয়ে করে যা কেঁদেছি, তার তো তুলনাই হয় না, আর সে দিন সাহেবের সঙ্গে বচসা করে যা কেঁদেছি সে কথা মনে করে এখনও যে আমার ভয়ানক কান্না পাচ্ছে। দেখুন আমি বড়ো...’ আর বলিতে পারিলাম না, কণ্ঠরোধ হইয়া আসিল।
লোকটার বিপুল কান্না দেখিয়া প্রথমে ভয় পাইয়াছিলাম আমি, তারপর আমারও সুবিপুল ইতিহাস শুনাইয়া মনে করিয়াছিলাম, বুঝি এবার সেও চোখমুখ হইতে সবেগে হাত সরাইয়া আস্তিন গুটাইয়া উলটা আমার মুখের দিকে শঙ্কায় চাহিয়া থাকিবে। কিন্তু এ কী হইল! কান্নার ইতিহাস শুনাইয়া আর একজনের কান্নার বেগকে আরও কয়েক ডিগ্রি বাড়াইয়া দিলাম যে! মরিয়া হইয়া বলিলাম, আহা, অত কাঁদছেন কেন? এমন ভেঙে পড়লে কি চলে? বিরাট মহীরুহ যিনি, জীবনযুদ্ধে তাঁকে অত সহজে ভেঙে পড়লে কি চলে? কত কত ঝড়ের বাধাবিপত্তি তাঁকে সয়ে যেতে হয়, অটল থাকতে হয়, আপনি তো এক বিরাট মহীরুহ!’
অতঃপর অনেক অনুনয় বিনয় করিয়া, অনেক ছোটোখাটো ইতিহাস শুনাইয়া, অনেক চেষ্টা করিয়া যা জানিতে পারিলাম তা এই: তাহার বড়ো ছেলেটি নিশ্চয় আমি দেখিয়াছি, সেই ছেলের সঙ্গে আজ ভোরবেলায় সামান্য এক কথা নিয়া বচসা, তারপরেই ঝগড়া এবং এমন কথা কি কেউ শুনিয়াছে—ঝগড়ার কথা না-হয় বাদই দেওয়া গেল—জন্মদাতা পিতার শতদোষ থাকিলেও, পুত্র তাহাকে মারিতে উদ্যত হয়? এবং এখন কী করিতে হইবে, সেটা আমার মতো লোকেরই বিবেচ্য, যেহেতু আমি তাহার প্রতিবেশী—ঘনিষ্ঠতম প্রতিবেশী, এই দারুণ বিপদে সাহায্য করিবার দায়িত্ব আমারই সবচেয়ে বেশি। অবশেষে আমিও তাহার অনুরোধ অনুযায়ী তাহাদের পিতা-পুত্রের কলহের সকল দায়িত্ব গ্রহণ করিয়া একটি ভীষণ দায়িত্ববোধের প্রেরণাতেই সকল তথ্য নির্ভুল হিসাবে সংগ্রহ করিবার জন্য অতি বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করিলাম ছেলেটির নাম কী?
বাজখাঁই গলায় উত্তর আসিল, জহরলাল! বলার ভঙ্গিতে আশ্চর্য হইয়া সভয়ে পিতৃভক্ত জহরলালের পরম ভাগ্যবান পিতার দিকে চোখ বড়ো করিয়া তাকাইলাম। এতক্ষণ কেবল তাহার কান্ন্া নিয়াই বিশেষ ব্যস্ত ছিলাম, লোকটার সকল অবয়বে বিশেষ নজর দেওয়ার বিশেষ সুযোগ পাই নাই, এখন দিলাম। প্রথমেই দৃষ্টিতে পড়ে তাহার মাথাটি, সেখানে একেবারেই গড়ের মাঠ, মুখের দাড়ি-গোঁফ কামানো, দুটি দীর্ঘাকৃতি কানে ছোটো-বড়ো কাঁচা-পাকা লোম, গায়ে শার্টও নহে পাঞ্জাবিও নহে এমন একটি জামা, হাঁটুর উপর কাপড়, পায়ে কাপড়ের জুতা এবং গায়ের রঙ-এ কৃষ্ণ।
পিতা-পুত্রের কলহের দায়িত্ব গ্রহণ করিয়া তথ্যসমূহ সম্পূর্ণ মানসেই আবার সাহস সঞ্চয় করিয়া বলিলাম, ‘দেখুন আমার ধৃষ্টতা মাপ করবেন, আপনার নামটি আমার এখনও জানা হয়নি! নামটি কী জানতে পারি?’
তেমনি গলায় উত্তর আসিল, ‘পুথ্বীরাজ সিংহরায়!’ চমকিয়া উঠিলাম। পৃথ্বীরাজ পিতা জহরলাল পুত্র! তথ্য সম্পূর্ণ করিতে হইলে আরও কত যে সংযুক্তা—কমলা-ইন্দিরা-জয়চন্দ্রের মতো, এমনকী শিবাজি প্রতাপসিংহেরও মতো আরও কত যে বীর-বীরাঙ্গনা নরনারীর সন্ধান মিলিবে, সে কথা মনে করিয়া সাহস সঞ্চয় করা আর হইল না! সুরমার আশায়
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments