পথবর্তী

ঘরে আর কেউ নেই।

মালতী জিনিসটা এপিঠ-ওপিঠ করে বললে, ‘আহা, এটা কী দিয়ে তৈরি বলুন তো?’

সুব্রত ঢালটি পরীক্ষা করে বললে, ‘নিশ্চয় লোহা’।

মালতী খিল খিল করে হেসে উঠল, হাসতে হাসতে বললে, ‘মোটেই নয়, তার ধার-কাছ দিয়েও নয়। এটা গন্ডারের চামড়া দিয়ে তৈরি। দেখতে ঠিক লোহার মতো মনে হয়, না?’

সুব্রত বিস্ময়ের স্বরে বললে, ‘হ্যাঁ, কিন্তু এ দিয়ে গুলি ফেরানো যায়?’

—‘হুঁ, খুব যায়। গন্ডারের চামড়া যে খুব শক্ত এটা জানেন না?’

—‘জানি।’

—‘তার চেয়েও শক্ত এটা। জলে ভিজিয়ে রোদে শুকিয়েছে, একেবারে লোহার মতো হয়ে গেছে। এগুলো আগে আরও অনেক ছিল, হাতে হাতে কতগুলো নিখোঁজ হয়ে গেছে, এখন এই কয়টি মাত্র আছে।’ মালতী ঢালটি আবার নেড়েচেড়ে বললে, ‘মনে করুন এর মধ্যে কত গুলি এসে লেগেছে, কত লোকের প্রাণ বাঁচিয়েছে এটা।’

সুব্রত বললে, ‘অনেক ক্ষেত্রেই এর প্রাণ বাঁচানোর কোনো অর্থই হয়তো নেই মালতী। ধরো, এখন যারা আত্মরক্ষা করে এটা দিয়ে অথচ নীতি তাদের ভালো নয়, হয়তো পাজি, অত্যাচারী—তখন সেই আত্মরক্ষার পক্ষে কী অর্থ হতে পারে? মানে তখন ওর কোনো মূল্যই নেই?’

—‘একেবারে ভুল!’ মালতী হাত নেড়ে বললে, জীবন রক্ষা, তা শত্রু-মিত্র যারই হোক, বা যে কোনো রকমের হোক—শেষপর্যন্ত জীবনের রক্ষাই। সুকৃতি-দুষ্কৃতির মূল্য, সেটা মানুষের দাবি, তারই নিজস্ব ব্যাপার, তাতে এই ঢালের কী এসে যাবে। এর যা মূল্য আছে, আছেই। তেমনি মানুষের বেলায়ও।’

মালতি মাঝে মাঝে গম্ভীর হয়ে কথা বলে বটে! সুব্রত এতে একটুও আশ্চর্য হল না এবং হেসে বললে, ‘তুমি ভুল করছ। যে একটা খারাপ কাজ করছে তাকে জেনে-শুনে সহায়তা করলে প্রশ্রয় দেওয়া হয় জান?’

—‘হুঁ। তাতে আমার কী এসে-যাবে?’

—‘এসে-যাবে এই যে, তুমিও তার ফল ভোগ করবে। কারণ, একটা পাপকে প্রশ্রয় দিয়েছ।’

মালতী হাঁ করে তার দিকে কতক্ষণ চেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল, কিছু বলল না।

বেশি রাত না হলেও চারদিক প্রায় নিস্তব্ধ।

এমন সময় ব্রজকিশোরবাবুর ডাক শোনা গেল। মালতী ব্যস্ত হয়ে বললে, ‘আপনাকে বাবা ডাকছেন, চলুন।’

একটা বড়ো ঘর। পুরোনো আসবাবপত্রে ভরা। দেওয়ালে বড়ো বড়ো ছবি, সোনালি কাজ করা ফ্রেম দিয়ে আঁটা। বেশির ভাগই রবি বর্মার—আর কয়েকটি বিদেশি চিত্রকরের আঁকা। ছাদের সাথে যুক্ত কয়েকটি অকর্মণ্য ঝাড়। ঘরের আলোটা—তেলের প্রদীপটাও দেওয়ালের গায়ে। মেঝেটা আয়নার মতো চকচক করে। বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। একপাশে প্রকাণ্ড পুরোনো দিনের খাট—তাতে খুব পুরু বিছানা—ধবধবে চাদর। সেখানে একটা মোটা তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে ব্রজকিশোরবাবু বসেছিলেন। তাঁর মাথায় চুল বেশি নেই, খুব ছোটো ছোটো করে কাটা, মুখটা বড়ো বড়ো একজোড়া গোঁফ, শরীরের চামড়া ঢিলে হলেও খুব বলিষ্ঠ। গায়ের রঙ খুব ফরসা।

তিনি চোখ বুজে বসেছিলেন। সুব্রত যে এসেছে টের পাননি।

সুব্রত বললে, আমাকে ডেকেছিলেন?’

ব্রজকিশোরবাবু চোখ মেলে বললেন, ‘হ্যাঁ। একা বসে আছি এই মনে হল সুব্রতকে ডেকে না-হয় কতক্ষণ গল্প করি। কোনো কাজ ছিল?’

—‘না, কাজ আবার কী? এখানে এসেও যদি কাজ থাকে তাহলে তো মুশকিল।’

ব্রজকিশোরবাবু হেসে বললেন, ‘কেন, ধরো চিঠিপত্র লেখা, পড়াশুনা করা। ও কী—বসো।’

সুব্রত বিছানার একপাশে বসল।

ব্রজকিশোর বললেন, ‘পূজো আসছে অথচ এখন মনেই হচ্ছে না পুজো বলে কিছু আছে! এমনি দিনকাল। মানুষ কী করবে? আগে খাবার, তারপর তো কাজকর্ম!’

সুব্রতও আশ্চর্য হল একথা শুনে। প্রাচীন—বিশেষত যাঁরা ধর্মপ্রাণ তাঁদের মুখে এমন কথা বড়ো শোনা যায় না।

ব্রজকিশোরবাবু বললেন, ‘মানুষের এইসব হৃদয়বৃত্তির মূলে, এটা তো জান, অনেক শ্রদ্ধা—ইচ্ছা থাকে, কাজেই যখন এগুলোও কোনো অনিবার্য কারণে বন্ধ হয়ে যায় তখন ওপর থেকে কোনো অভিশাপের ভয় নেই—কী বল? অথচ অনেকে

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice