ভালো-না-লাগার শেষ
রমলা বিরক্ত হয়ে উঠল। যেন এত বিরক্তি তার কোনোদিন আসেনি। নইলে ইকনমিক্সের পপুলেশন চ্যাপ্টারটা তো জমে ওঠবার কথা কিন্তু আজকার ক্লাসে কিছুতেই যেন তার লেকচার গভীর হয়ে উঠল।
এমন এক-একটা দিন আসে সত্যি যখন কিছই ভালো লাগে না। আজ যেন তাই। সে যেন আজ প্রথম টের পেল, ইস্কুলের মেয়েদের চেয়ে কলেজের মেয়েরা গোলমাল করে বেশি। অথচ এখানে কিছুই বলা যায় না, ইস্কুলের মতো যায় না বেঞ্চির ওপর দাঁড় করানো, যায় না কান মলে দেওয়া। ইস্কুল থেকে কলেজে উঠে মনে করে, কী-না-কী করে ফেললাম; দুর্ভাগ্য সব। তার মেয়ে যদি হয়, সে কোনোদিন তাকে কলেজে পড়াবে না। পড়িয়ে বা লাভ কী? কিছু বোঝে না, কিছু জানে না, কেবল চোখ বুজে মুখস্থ; আর পরীক্ষা খারাপ দিলে হাউ-হাউ করে কান্না, ফিট—আরও কত কী! কিন্তু কাজের বেলায় দ্যাখো, সব পেছনে পড়ে আছে। নাচের যত পারফর্ম্যান্স দিক, একাই কলেজে আসুক, বেড়াক একা, এক মিনিটে হাজারো কথা বলুক—এখনও তাদের মনে পাঁচশো, এক হাজার, পাঁচ হাজার, বলো-তো দশ হাজার বছর আগেকার আদিম মনোবৃত্তি আছে বেঁচে।
অথচ পুরুষেরা এমনি বোকা যে এসব তারা মোটেই জানে না, ধরে নেয় অন্যরকম। কত কবিতা লিখে ফেলে, দেহের রূপ-সাধনায় হয়ে ওঠে তৎপর। রমলা যদি পুরুষ হত তবে দিত সব প্রকাশ করে।
রমলা হাসল, তাহলে কী মজা হবে। দুর্মূল্যতা, অহংকার, লজ্জা সব চুরমার হয়ে যাবে।
রমলার মন আজ ভালো নেই। বলেছি তো, এত বিরক্তি আর অবসাদ তার কোনোদিন আসেনি। দেড়টার পর এক ঘণ্টা লিজার। সে কলেজ-বিল্ডিংয়ের সবচেয়ে নির্জন জায়গা দোতালার ছাদে যাওয়ার সিঁড়ির কাছে যে এক টুকরো বারান্দা আছে সেখানে এসে দাঁড়াল। অন্যদিন হয়তো লাইব্রেরিতে গিয়ে বসত; গল্প করত প্রভাদির সঙ্গে, ভারি মজার লোক তিনি, হাসাতে-হাসাতে মারেন, কিন্তু আজ তার কী হল, সে রেলিংয়ে ভর দিয়ে বুকের কাছে এক হাতে মার্শালের ইকনমিক্স চেপে দাঁড়িয়ে রইল চুপ করে। নীচে কিছু দূরে দেখা যায়, গেটের কাছে বেল গাছের ছায়ায় বসে কলেজের দরওয়ান কার সাথে গল্প করছে। ঘণ্টা পড়বার পর মেয়েরা ক্লাস বদলিয়েছে, এখনও দু-একটি মেয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। দুপুরের দমকা বাতাস মাঝে মাঝে গায়ে এসে লাগছে; কপাল আর গালের কাছে দু-এক গোছা চুল উড়ছে বাতাসে। আকাশে ছেঁড়া সাদা মেঘ।
রমলা কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আবার কী মনে করে প্রফেসরদের বিশ্রাম-কক্ষের দিকে গেল, কিন্তু সেখানে প্রভাদি নেই। তাহলে তিনি অসেননি, নাকি আবার প্রিন্সিপালের ঘরে গিয়ে গল্প করছেন?
একপাশে বসে নতুন-নিযুক্ত অরুন্ধতী বসু নিবিষ্ট মনে কী যেন পড়ছে।
রমলা কোনো সাড়া না দিয়ে নিঃশব্দে প্রিন্সিপালের ঘরে গিয়ে হাজির হল।
প্রভাদি সত্যি আসেননি।
প্রিন্সিপাল নির্মলা রায় গম্ভীরভাবে কাগজপত্র দেখছেন। পাশের চেয়ারে ইংরিজির অধ্যাপক সুধীরবাবু বসে আছেন, কোনো কাজ আছে বোধ হয়।
রমলা চকিতে একবার সেদিকে চেয়ে বললে, ‘শরীরটা ভারি খারাপ বোধ হচ্ছে নির্মলাদি?’
নির্মলা মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী বললে ভাই?’
তিনি রমলাকে ‘তুমি’ বলেই সম্বোধন করেন, রমলার সাথে তাঁর আত্মীয়তার একটু সূত্র নাকি আছে, আর তাছাড়া সে কলেজের সবচেয়ে অল্প-বয়সি অধ্যাপিকা।
রমলা বললে, ‘ভারি exhausted feel করছি।’
—‘বোর্ডিং-এ চলে যেতে চাও?’
—‘If you permit—’
নির্মলা তাড়াতাড়ি বললেন, ‘যাও।’
একটু হেসে রমলা চলে এল।
কলেজের লাইব্রেরি। বুড়ো লাইবেরিয়ান টেবিলের ওপর ভর দিয়ে বই পড়ছেন। ঘরে আর কেউ নেই।
রমলা একটা বই নেবে। বই দিয়ে সে তার ভালো-না-লাগার সময়গুলো কাটাবে। সে বললে, ‘শ’র কোন্ বই সবচেয়ে ভালো হবে, আপনি জানেন যদুবাবু?’
যদুবাবু বললেন, ‘আমাদের এখানে তো সব বই নেই, Man and
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments