মাম্বেতের টুপি
মাম্বেতের বয়স আট বছর। শীতের চারণমাঠে সে এল এই প্রথম।
সবই তার কাছে নতুন। ইচ্ছে হয় তক্ষুনি সারা এলাকাটা ঘুরে আসবে। ছুটে বেড়াবে ভেড়ার পালের পাহারাদার কুকুরগুলোর সঙ্গে। চেয়ে দেখবে তার আদরের শাদা-লেজো ভেড়াটাকে। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, তার বাপ-মায়ের এখনকার ঘরটির তলে গিয়ে ঢুকবে, কেননা ওটা তো সাধারণ ঘর নয়, চাকায় বসানো। কোনো ভিত নেই তার, শুধু চারটে চাকা। সবচেয়ে আগে অবিশ্যি দরকার আশপাশটা দেখা।
মা-বাপে কিন্তু মাম্বেতকে ছাড়ছিল না। কেবলি জিজ্ঞেস করছিল গাঁয়ের লোকের খবর কী, কেমন আছেন দিদিমা, কাকু কী করছে...
এদিকে শীতের সন্ধে তো ছোট্ট। দেখতে-না-দেখতেই বাতি জ্বলে উঠল, শুরু হল রাতের খাওয়া। শুইয়ে দিল মাম্বেতকে। বলল, এতটা পথ, হয়রান হয়েছিস, ঘুমো।
মা লণ্ঠন জে¦লে ভেড়াগুলোকে দেখতে গেল। বাবাও ঘুমুতে গেলেন। গোটা দিনরাত ডিউটি দিয়েছে তিনি, তাই সঙ্গে সঙ্গেই গোটা ঘর জুড়ে বাঁশি বাজাতে লাগলেন। ঘুমের সময় অন্য লোকের মতো তাঁর নাক ডাকে না, নাক দিয়ে শিস বেরোয়।
সবই চুপচাপ হয়ে যাবার পর উঠল মাম্বেত, জানলার ওপর রাখা লণ্ঠনের ফিতেটা একটু বাড়িয়ে দিল। জুতো পরল। গায়ে চাপাল মায়ের ফার কোট, এতই সেটা জাবড়া যে ঠান্ডা, গরম, বৃষ্টি কিছুতেই ভাবনা নেই। বাপের মস্ত লোমের টুপিটা মাথায় দিয়ে চুপি চুপি বেরিয়ে এল কনকনে কালো অন্ধকারে।
তিয়ানশান পর্বতের ফেরুয়ারির রাত অন্ধকার, হিমেল। বুনো বাতাস গজরাচ্ছে যেন ভুখা নেকড়ে, তাড়িয়ে আনছে কখনো তুষার কণা, কখনো বৃষ্টি, কখনো বা খোঁচামারা বরফ-ঝড়। রাখালদের সেই একলা ঘরের আশেপাশে ঝোপঝাড়ও নেই, বাগানও নেই। শুধু পাহাড়গুলোর মাঝখানে বারোমেসে বরফে ঢাকা এক সমভূমি। বিকেলে মাম্বেত যখন এসেছিল, তখন চারদিকে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল, শোনা যাচ্ছিল। এখন ঝড়ের ফুঁসন্ত গর্জনে ভেড়ার ডাক পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে না, সবাই তারা ঝড়ের ঝাপটা থেকে লুকিয়েছে ঘরের অন্যপাশে। কিছু যে দেখবে তাও অসম্ভব। থেকে থেকে শুধু শোঁ শোঁ অন্ধকারে দেখা দিচ্ছে একটা ঘোলাটে হলুদ ছোপ। ওটা মা’র লণ্ঠনের আলো, সারারাত ভেড়ার পালের কাছে ঘুরবে মা।
মায়ের জন্যে মায়া হল মাম্বেতের। নিশ্চয় ভারী ঠান্ডা লাগছে মায়ের, ভয় লাগছে। মায়ের দিকে এগিয়ে গেল মাম্বেত।
ঝড়ের ডাকে মা নিশ্চয় শুনতে পায়নি, মাম্বেত এগিয়ে এসেছিল একেবারে কাছে। ভেবেছিল কথা কইবে, হঠাৎ দেখে মা এমনভাবে থেমে গেল যেন কী একটা অলক্ষণ দেখেছে। মাথা হেঁট করে বাতাসে তার বাঁ কানটা পেতে কী যেন শুনতে লাগল।
মাম্বেতও থমকে গেল। চেয়ে দেখতে লাগল অন্ধকারে। ভাবল, মা নিশ্চয় ভেড়াদের কোনো একটা বিপদ টের পেয়েছে।
‘আপা , কী হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করল সে ভয়ে ভয়ে। কিন্তু ভেজা ভেজা ঘন বাতাসের ঝাপটায় তার কথাগুলো ডুবে গেল।
‘আপা!’ প্রাণপণে চিৎকার করে মাম্বেত ছুটে গেল মায়ের কাছে।
‘আহ, তুই, মাম্বেত! আমি এদিকে ভয়ে মরি। ভেবেছিলাম নেকড়ে ওঁৎ পাতছে। কিছুই দেখছি না, শুনছি, না, আর পিঠ দিয়ে টের পাচ্ছি কে যেন রয়েছে, কাছিয়ে আসছে।’
‘তুমি মা সব সময় বলো যে পিঠ দিয়ে টের পাচ্ছ। সে আবার কী?’
‘শুধু আমার বেলায় নয় রে, সব রাখালের বেলাতেই তাই।’ ছেলেকে ওয়াটারপ্রুফে ঢেকে বলল উরুমকান, ‘সারারাত হয়তো টহল দিলাম, কিছুই নেই। হঠাৎ মনে হয় হুঁশিয়ার, কে যেন পেছনে গুঁড়ি মেরে যাচ্ছে পালের দিকে।’
শুনে মাম্বেতের গা শিরশির করে উঠল।
‘বুঝতে-না-বুঝতেই ছোটাছুটি লাগায় কুকুরে, ডাকতে শুরু করে।’
‘আচ্ছা আপা, আজ তোমার পিঠে কিছু টের পাচ্ছ না?’
‘ঠান্ডায় আজ এমন জমে গেছি যে নেকড়ে আঁচড়ালেও পিঠে কিছু টের পাব না।’
‘ভেড়ার বাচ্চাগুলোও সব জমে যাবে।’ সংসারী লোকের মতো নিশ্বাস ফেলল মাম্বেত, ‘শোনো
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments