কান্না
গুরুদয়ালের পায়ে ব্যথা, হাঁটিতে কষ্ট হয়। তবু না হাঁটিলে বুঝি তার চলে না? সকালবেলা বাহির হইয়া যায়। কোনোদিন দুপুরে ফিরে, কোনোদিন ফিরেও না। কোনোদিন সূর্যের অস্তগমনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামে ফিরে, ফিরিয়া হয়তো অপরিচ্ছন্ন বিছানাটা হাতড়াইয়া দেশলাই বাহির করিয়া 'ডিবা' জ্বালিল, না-হয় তো বাড়ির পূব দিককার নিমগাছটার তলায় হাত-পা ছড়াইয়া দিয়া গান ধরিল:
রাধে, রাধে গো রাধে,
তোর লাগি মোর পরাণ কাঁদে;
নইলে কি আর কালো শশী
অতি সাধের চূড়া বাঁশী
অই চরণে তুলে দিল সাধে,
রাধে, রাধে গো রাধে...
বাড়ির একমাত্র অধীশ্বর সে। সে ছাড়া এবাড়িতে আর একটিও জীবন্ত প্রাণী নাই। কাজেই তার এই স্বেচ্ছাচারিতা। কেহই বাধা দেয় না।
প্রতিবেশীদের কেহ কেহ বলে, কি হে গুরুদয়াল, তুমি যে বড্ড ঘোরাফেরা কর। ঘরে তো একবারও পাবার জো-টি নেই।
গুরুদয়াল একটু মৃদু হাসিবার চেষ্টা করিয়া বলে, কি করব বল, ঘরে যে মন টেকে না!
পূর্ববর্তী বক্তা হয়তো একটি ছোট দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়িয়া সংক্ষেপে বলে, তাইতো!
আবার কেউ হয়তো জিজ্ঞাসা করে, বলি ও গুরুদয়াল, বাইরে বাইরে ঘুরেই বা তুমি কোন শান্তিটা পাও বল দেখি। যার ঘরে শান্তি নেই তার বাইরেও অন্ধকার! কথায় বলে লক্ষ্মীছাড়া...
বলো না, বলো না, বলতে নেই, গুরুদয়াল প্রবলভাবে বাধা দিয়া বলে, ও কথা আর মনে করিয়ে দিও না দাদা, পায়ে পড়ি তোমার। তাকে ভুলতে দাও, ভুলতে দাও।
—আ আমার পোড়া কপাল! মনের মধ্যে যে সব কিছু গেঁথে রেখেছ, তাকে যে একটুও ভুলতে পারছো না, তা কি আমরা জানি না? যতই বল না কেন, গুরুদয়াল, তুমি যে তাকে ভুলে গেছ, বাইরে ঘটা করে সে কথাটা জানিয়ে দিলেও, আমরা তোমার অন্তরের খবর জানি। কচি খোকা নই আমরা। আহা, কি ভালো মানুষ—
—পাগল করলে দেখছি! আচ্ছা বল দেখি, চিরদিনের জন্য কে সংসারে আসে? গানে আছে না, জন্মিলে মরিতে হবে খাঁটি জানা শুনা, দুদিনের তরে কেন এতো বিড়ম্বনা। যে মরেছে, সে বেঁচেছে।
বাস্তবিক গুরুদয়ালের সঙ্গে কথায় পারিবার জো নাই। সহানুভূতিশীলগণ অগত্যা সরিয়া পড়েন।
অন্তঃপুরে মেয়েদের মধ্যেও গুরুদয়ালের সম্বন্ধে আলোচনা হয়। কেউ বলে বেচারা ঘুরে ঘুরে সারা, অথচ কি কাজে কোথায় যে ঘোরে বলা শক্ত। আমার মনে হয় একটু ছিট ধরেছে।
নিবারণের মার এক বোন-ঝি বেশ লেখাপড়া জানে। তার মুখেই নিবারণের মা শুনিয়াছিল। তাই বলিল, একটা নেশা গো, বিনোদের মা, তুমি যাই বল না কেন, একটা নেশা। এতে কিন্তু যা আনন্দ পাওয়া যায়, ঘরের কোনে বসে থাকলে তার অর্ধেকও পাওয়া যায় না। একে বলে ভ্রমণের আনন্দ।
—রেখে দে তোর ভ্রমণের আনন্দ। থাকতো বউটা আজ। এক নাক-ঝাড়ায় উঠাতো আর এক মুখ-নাড়ায় বসাতো। অমন করে ঘুরে বেড়ানো-তার সাধ্যি ছিল কি, বাড়ির উঠান থেকে পা বাড়ায়। আমি জানি গো, সব জানি, বউটা মরে যেতে না যেতেই-ও মনুর মা কথা বলছিস না যে, শুনিস নি কি তুই চর-রাজপুরের সেই কেলেঙ্কারীটা! কেমন মানুষ সে, তা আমার ভালো মতোই জানা আছে। পড়ত আমার হাতে, ঝেটিয়ে-প্রবীণা গৌরাঙ্গসুন্দরীর মা উত্তেজিত হইয়া উঠে।
গুরুদয়ালের এক দুর-সম্পর্কীয়া পিসী বলে, যাই বল না কেন বড়-বউ, ছেলেটার জন্য ভারি কষ্ট হয় আমার। দিন দিন কেমন যেন শুকিয়ে যাচ্ছে। তবু তার ধর্মে মতি হয়েছে বলে আমার ভারি আনন্দ হয়। দেখিস নি, যতক্ষণ বাড়িতে থাকে কারো সঙ্গে কথাটি বলে না। সে আবার নাম জপ করে। কোনো গোঁসাইর কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েছে বুঝি। কিন্তু ও থাকবে না, তিনি বাঁ হাতে চোখের কোন হইতে একটু জল মুছিয়া লইয়া বলেন, ও
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments