কামার ও তার স্ত্রী
অনেক দিন আগের কথা। এক শহরে বাস করত এক দক্ষ কামার। মানুষ যতকিছু জিনিসের কথা জানে সবকিছুই সৃষ্টি করতে পারত তার হাত দুটি—সে হাত দুটি পারত না কেবল কামার আর তার বৌয়ের জন্য যথেষ্ট আহার যোগাতে। সেই শহরের লোকেরা ছিল খুবই গরীব, তাই কামার কোথাও কোন কাজ না পেয়ে খুবই কষ্টে দিন কাটাচ্ছিল। সে কখনও মনখারাপ করত না, সবসময়েই ঠাট্টাতামাসা করত, গান গাইত, কিন্তু দুঃখেকষ্টে তার মনটা পুড়ে কয়লার মতই কালো হয়ে গেছে। সে নিজে সব দুঃখকষ্টই সহ্য করতে পারে, কিন্তু তার অল্পবয়সী বৌ, অমন সুন্দরী একশো বছরে একজন জন্মায়, সে অভাবে এত কষ্ট পাচ্ছে দেখে তার ভীষণ দুঃখ হয়। এই সব দেখে কামারের মনে হল সে রাজধানীতে গিয়ে রোজগার করার চেষ্টা করবে, সেখানে ধনী লোকেদের হয়ত প্রয়োজন হবে তার হাতের তৈরী জিনিসপত্র।
স্ত্রীর কাছে বিদায় নেওয়ার সময় বলল: ‘প্রিয়তমা, তিন বছরের জন্য আমি বিদেশে যাচ্ছি। তুমি কি আমাকে মনে রাখবে? আমাদের এই দীর্ঘ বিচ্ছেদে তুমি অবিশ্বাসিনী হবে না তো?’
তার স্ত্রী নীচু হয়ে মাটি থেকে তুলে নিল একটা নীল ফুল। ফুলটা সে স্বামীর হাতে তুলে দিল এই বলে: ‘প্রিয় আমার! এই ফুলটা নিয়ে তুমি তেমনই যতনে রাখবে যেমন আমি রক্ষা করব তোমার স্ত্রী হিসেবে আমার মর্যাদা। যেখানেই তুমি থাক না কেন, যতই পথ অতিক্রম কর না কেন, জানবে এই ফুলটা যতদিন বিবর্ণ হয়ে যাবে না, তোমার প্রতি আমার ভালবাসাও ততদিন অম্লান হয়ে থাকবে…’
রাজধানীতে এসে পোঁছে কামার এক চাখানায় ঢুকল চা খেয়ে পথের ক্লান্তি কাটাবে বলে। অন্যান্য লোকদের সঙ্গে সেখানে বসেছিল ভাল পোশাকআশাক পরা তিনজন পুরুষমানুষ, কোনো কথা বলছিল না তারা, খাবার-দাবার কিছই ছুঁচ্ছিল না, তাদের মনে যেন কোন গভীর উৎকণ্ঠা জমে আছে। অজানা লোকটিকে সেখানে ঢুকতে দেখে সেই তিনজন তার দিকে এমন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল যে অস্বস্তি লাগল কামারের।
‘আপনারা আমার দিকে অমন করে তাকিয়ে আছেন কেন, হুজুর?’ বলল কামার। ‘আমি গরীব কিন্তু সৎ লোক। অনেক দূর থেকে এখানে এসেছি রোজগারের আশায়। আমি পেশায় কামার, আমাকে কোন কিছু তৈরী করতে দিলে জীবনেও কখন পস্তাতে না।’
সেই তিনজন পরস্পরের মুখ চাওয়াচায়ি করল, তারপর তাদের মধ্যে যে বয়সে সবচেয়ে বড়, সে কামারকে কাছে ডেকে বন্ধুত্বপূর্ণ স্বরে বলল: ‘আমার প্রতিটি কথা মন দিয়ে শোন হে, কামার। আমরা তিনজন এ রাজ্যের উজীর, চাখানার মালিককে সেকথা জানাতে চাই না আমরা। বাজার, সরাইখানা, চাখানা আর যেখানে অনেক লোক জড় হয় সেসব জায়গায় আমরা ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজেই, ফুর্তি করা বা কৌতুহলবশত নয়। খান আমাদের আদেশ দিয়েছেন তাঁর জন্য সোনারূপো দিয়ে এক প্রাসাদ তৈরী করে দিতে; যদি তাঁর আদেশ আমরা পূরণ করতে পারি তো আমাদের পুরস্কার দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আর যদি নির্দিষ্ট সময়ে প্রাসাদ নির্মিত না হয় তাহলে আমাদের মৃত্যুদণ্ড হবে। খুবই বিপদে পড়েছি আমরা, সময় এগিয়ে চলেছে কিন্তু আমরা গোটা রাজধানী ঘুরে এমন একজন দক্ষ কারিগরকে পেলাম না যে এমন একটা অসাধারণ কাজ হাতে নেওয়ার সাহস করবে। তুমি যদি আমাদের কোনরকম সাহায্য করতে পার কাজটা না করলেও পরামর্শ দিয়ে অন্তত!’
অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে কামার বলল: ‘উজীরমশাই, আমার ভাগ্যই এই চাখানার দরজা খুলে দিয়েছে। যত সোনারূপোর দরকার আমাকে দিন আর চাই সত্তরজন সাহায্যকারী, আমি যথাসময়ে তৈরী করে দেব এমন এক প্রাসাদ যা কোন দেশের কোন খানেরই ছিল না কখনও।’
সেইদিনই কাজ আরম্ভ করে দিল কামার। হাপরের আগুন উঠল, দামী ধাতুর ওপর হাতুড়ির ঠনঠন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments