পরিচিতি কেন্দ্রিক রাজনীতির চ্যালেঞ্জ
বর্তমানকালে সমগ্র বিশ্বজুড়ে পরিচিতি সত্তার রাজনীতি সাধারণভাবে রাজনীতি এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান উপাদান রূপে উঠে এসেছে। ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত পরিচিতি কেন্দ্রিক রাজনীতির ধারণারই কোনও অস্তিত্ব ছিল না। সময়টা হল ১৯৮০-র দশক, যখন থেকে পরিচিতির রাজনীতি গুরুত্ব লাভ করতে থাকে।
পটভূমি
১৯৮০-র দশকে বিশ্বায়িত ফিনান্স পুঁজির ইন্ধনে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের আবির্ভাব। নয়া উদারবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও কার্যক্রম এই সময় থেকে জোরদার হতে শুরু করল। তথ্য-প্রযুক্তির মতো নতুন বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি বিশ্বায়ন এবং ফিনান্স পুঁজির গতিশীলতাকে ত্বরান্বিত করল।
বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের এই পর্যায় এবং সমাজতন্ত্রের পতন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভাজন সমসাময়িক। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি হল শোষণ। সমাজতন্ত্র থেকে পশ্চাদপসরণের কারণে শোষণ থেকে মুক্তির সর্বজনীন লক্ষ্যে পৌঁছানো দুর্বল হয়ে পড়ল।
সমাজতন্ত্রের পতনের সঙ্গে সঙ্গে জাতিগত পরিচিতি এবং ভ্রাতৃঘাতী বিবাদের পুনরুত্থান হয়। বলকান অঞ্চলে, পূর্ব-ইউরোপ এবং পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নে এই পুনরুত্থান নাটকীয়ভাবে বিস্ফোরণের রূপ নেয়।
ফিনান্স পুঁজি পরিচালিত পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের আক্রমণাত্মক আবির্ভাব এবং সমাজতন্ত্রের দুর্বল হয়ে পড়া একত্রে পরিচিতির রাজনীতির উত্থানের পটভূমি রচনা করেছে।
জাতিগত পরিচিতির রাজনীতি এবং জাতিগত জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক দ্বন্দ্ব এবং ভ্রাতৃঘাতী বিবাদের জেরে যুগোস্লাভিয়া টুকরো টুকরো হয়ে যায়। স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের গড়ে ওঠা, বসনিয়ার যুদ্ধ এবং যুগোস্লাভিয়ার মতো রাষ্ট্রের একাধিক রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়া বিশ্বব্যাপী পরিচিতির রাজনীতি ছড়িয়ে পড়ার পূর্বশর্ত হিসাবে কাজ করেছে। পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নেও বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলির নিজেদের মধ্যে বিবাদ ছিল। আন্তর্জাতিক ফিনান্স পুঁজি এবং ইউরোপীয় পুঁজি এই দেশগুলির বাজারে প্রবেশ করার সুযোগ খুঁজছিল। এহেন পরিস্থিতির ফলে জাতীয়তাবাদী বিবাদ আরও বেড়ে উঠল। নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে বাজার অর্থনীতির এবং নয়া-উদারনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা হল।
বিশ্বায়িত ফিনান্স পুঁজি অসংখ্য পরিচিতির ভিত্তিতে বিভক্ত জনগণের মধ্যে কাজ করা সুবিধাজনক মনে করে। তাতে বাজার ব্যবস্থায় প্রবেশ করা এবং তাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। ভোগবাদ এবং বাজার ব্যবস্থা প্রত্যেক গোষ্ঠীকে পরিষেবা প্রদান করে। কিন্তু অসংখ্য পরিচিতিতে বিভক্ত করে তাদের পুঁজির শোষণ এবং বাজারে পুঁজির কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেয় না।
সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের অন্তর্গত ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিযোগী গোষ্ঠীগুলিকে একত্রে নিয়ে চলে। এই গোষ্ঠীগুলি পরস্পর সামাজিক উদ্বৃত্ত এবং পণ্যের ওপর অধিকার দাবি করতে থাকে। শাসক শ্রেণির কাছে একটি সুসংহত গোষ্ঠী যে মৌলিক রাজনীতির ভিত্তিতে অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত এবং পণ্যের সুষম বণ্টনের দাবি করে তার পরিবর্তে বহু গোষ্ঠীর উপস্থিতি অবশ্যই সুবিধাজনক।
বিশ্বায়িত পুঁজি পরিচালিত ধনতন্ত্রের বর্তমান পর্যায় এবং তথ্য-প্রযুক্তি আনীত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মিলিত প্রভাব আছে সমাজের ওপর। ধনতন্ত্রের শেষ পর্যায়ে উত্তর-আধুনিকতার আবির্ভাব। মার্কসবাদ পরবর্তী তত্ত্ব উত্তর-আধুনিকতা পরিচিতি সত্তার রাজনীতির ভিত্তিভূমি হাজির করেছে।
উত্তর-আধুনিকতা কী?
উত্তর-আধুনিকতা একটি বুর্জোয়া দার্শনিক মতাদর্শ যা বিংশ শতাব্দীর ধনতন্ত্রের সাফল্যের কারণে এবং সমাজতন্ত্রের পিছু হটার কারণে উঠে এসেছে। এই মতাদর্শ মার্কসবাদের বিরোধী।
আলোকপ্রাপ্তি (Enlightenment) প্রকল্প মৃত এবং নিঃশেষিতÑএই গভীর বোধ থেকে উত্তর-আধুনিকতার জন্ম। আঠারো শতকে ইউরোপে যে আলোকপ্রাপ্তি শুরু উনিশ শতকে তা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। এই আলোকপ্রাপ্তি ব্যক্তিস্বাধীনতার সর্বজনীন মূল্যবোধ, প্রগতি এবং যুক্তিবোধের পথ উন্মুক্ত করে।
উত্তর-আধুনিকতা আলোকপ্রাপ্তির সমস্ত মূল্যবোধকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে এবং সর্বজনীনতা ও সামগ্রিকতা সম্পর্কিত সমস্ত দর্শন বা রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। সমস্ত সামগ্রিকতার তত্ত্বকে নস্যাৎ করে তার নাম দেওয়া হয়েছে মেটা ন্যারেটিভ। সমস্ত গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ তথা মেটা ন্যারেটিভ—উদারনীতি, সমাজতন্ত্র বা অপরাঅপর সর্বজনীনতার তত্ত্ব—সব বাতিল। উত্তর-আধুনিকতা অনুযায়ী মুক্তির লক্ষ্যে সমস্ত সর্বজনীন আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে নতুন দমন ও নিপীড়নের দিকে নিয়ে যায়। এই মতবাদ ধনতন্ত্র বা সমাজতন্ত্রকে কোনও কাঠামো বা ব্যবস্থা হিসাবে স্বীকৃতিই দেয় না। উত্তর-আধুনিকতা ভাষার সাহায্যে জ্ঞান এবং ক্ষমতাকে মধ্যস্থতা করে, যার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments