-
এক রাজার সাত রাণী। দেমাকে, বড়রাণীদের মাটিতে পা পড়ে না। ছোটরাণী খুব শান্ত। এজন্য রাজা ছোটরাণীকে সকলের চাইতে বেশি ভালবাসিতেন। কিন্তু, অনেক দিন পর্যন্ত রাজার ছেলেমেয়ে হয় না। এত বড় রাজ্য, কে ভোগ করিবে? রাজা মনের দুঃখে থাকেন।
এইরূপে দিন যায়। কতদিন পরে,—ছোটরাণীর ছেলে হইবে। রাজার মনে, আনন্দ ধরে না; পাইক-পিয়াদা ডাকিয়া, রাজা, রাজ্যে ঘোষণা করিয়া দিলেন,—"রাজা রাজভাণ্ডার খুলিয়া দিয়াছেন, মিঠাইমণ্ডা মণি-মাণিক যে যত পার, আসিয়া নিয়া যাও।
বড়রাণীরা হিংসায় জ্বলিয়া মরিতে লাগিল। রাজা আপনার কোমরে, ছোটরাণীর কোমরে, এক সোনার শিকল বাঁধিয়া দিয়া, বলিলেন,—"যখন ছেলে হইবে, এই শিকলে নাড়া দিও, আমি আসিয়া ছেলে দেখিব!" বলিয়া, রাজা, রাজদরবারে গেলেন।
ছোটরাণীর ছেলে
-
উত্তর থেকে বড়নদী দেখানে ব্রহ্মপুত্রের জলে এসে মিলেছে ঠিক সেই বাঁকের মুখেই কতকালের পুরানো ডিমরুয়ার আসামী রাজা আড়িমাওয়ের নাটবাড়ি। নাটবাড়ির নিচেই নদী মজে গিয়ে মস্ত চর পড়েছে। এত কাল থেকে হাড়গিলে পাখিরা এই চর দখল করে আছে যে, ক্রমে চরটার নামই হয়ে গেছে হাড়গিলার চর। এই চরের ওপারেই দেওয়ানগিরি মস্ত একটা বুড়ো আঙুলের মতো আকাশের দিকে ঠেলে উঠেচে। এই দেওয়ানগিরি হল যত ফরিয়াদি পাখির আড্ডা। একপারে রইল আসামী মাছেদের রাজা আড়িমাওয়ের নাটবাড়ি আর এক পারে দেওয়ানী ফরিয়াদির আড্ডা দেওয়ানগিরি, মাঝখানে বসে রয়েছেন হাড়গিলে। আসামী ফরিয়াদিতে লড়াই মোকদ্দমা প্রায়ই হয়, তাতে দুই দলই মাঝে-মাঝে মারা পড়ে।
হাড়গিলের খাম্বাজং রাজা দুই দলের
-
এক রাজার দুই রানী, দুও আর সুও। রাজবাড়িতে সুওরানীর বড়ো আদর, বড়ো যত্ন। সুওরানী সাতমহল বাড়িতে থাকেন। সাতশো দাসী তাঁর সেবা করে, পা ধোয়ায়, আলতা পরায়, চুল বাঁধে। সাত মালঞ্চের সাত সাজি ফুল, সেই ফুলে সুওরানী মালা গাঁথেন। সাত সিন্দুক-ভরা সাত-রাজার-ধন মানিকের গহনা, সেই গহনা অঙ্গে পরেন। সুওরানী রাজার প্রাণ।
আর দুওরানী— বড়োরানী, তাঁর বড়ো অনাদর, বড়ো অযত্ন। রাজা বিষ নয়নে দেখেন। একখানি ঘর দিয়েছেন— ভাঙাচোরা, এক দাসী দিয়েছেন— বোবা-কালা। পরতে দিয়েছেন জীর্ণ শাড়ি, শুতে দিয়েছেন— ছেঁড়া কাঁথা। দুওরানীর ঘরে রাজা একটি দিন আসেন, একবার বসেন, একটি কথা কয়ে উঠে যান।
সুওরানী— ছোটোরানী, তারই ঘরে রাজা বারোমাস থাকেন।
একদিন রাজা
-
রিদয় বলে ছেলেটা নামেই হৃদয়, দয়ামায়া একটুও ছিল না। পাখির বাসায় ইঁদুর, গরুর গোয়ালে বোলতা, ইঁদুরের গর্তে জল, বোলতার বাসায় ছুঁচোবাজি, কাকের ছানা ধরে তার নাকে তার দিয়ে নথ পরিয়ে দেওয়া, কুকুর-ছানা বেরাল-ছানার ল্যাজে কাঁকড়া ধরিয়ে দেওয়া, ঘুমন্ত গুরুমহাশয়ের টিকিতে বিচুটি লাগিয়ে আসা, বাবার চাদরে চোরকাঁটা বিঁধিয়ে রাখা, মায়ের ভাঁড়ার-ঘরে আমসির হাঁড়িতে আরশোলা ভরে দেওয়া— এমনি নানা উৎপাতে সে মানুষ, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, সবাইকে এমন জ্বালাতন করেছিল যে কেউ তাকে দু’চক্ষে দেখতে পারত না।
রিদয়ের মা-বাপ ছিল আমতলি গাঁয়ের প্রজা। দুজনেই বুড়ো হয়েছে। রিদয় তাদের এক ছেলে, বয়স হল প্রায় বারো বছর; অথচ ছেলেটা না শিখলে লেখাপড়া, না শিখলে চাষবাসের কাজ;
-
রংপো নদীটি খুব বড় নদীও নয় ম্যাপেতেও তার নাম ওঠেনি। ঘুম আর বাতাসিয়া দুই পাহাড়ের বাঁকের মধ্যে ছোট একটি ঝরণা থেকে বেরিয়ে নদীটি পাহাড়ের গা বেয়ে দু-ধারের বনের মাঝ দিয়ে নুড়ি পাথর ঠেলে আস্তে-আস্তে তরাইয়ের জঙ্গলে নেমে গেছে, নদীর দু-পার করঞ্চা টেঁপারি তেলাকুচো বৈচী ডুমুর জাম এমনি সব নানা ফল নানা ফুল গাছে একেবারে হাওয়া করা, মাথার উপরে আকাশ সবুজ পাতার ছাউনীতে ঢাকা, তলায় সরু নদীটি ঝি-ঝি করে বয়ে চলেছে! এই পাখির গানে ভোমরার গুনগুনে ফুল-ফলের গন্ধে জলের কুলকুল শব্দে ভরা অজানা এই নদীর গলি পথ দিয়ে হাঁসেরা নেমে চলেছে আবার সিলিগুড়ির দিকে। উপরে মেঘ করেছে, বনের তলা অন্ধকার। শেওলা
-
অনেককাল আগে এক সম্রাট ছিলেন, তিনি এতই সাজতে-গুজতে ভালোবাসতেন যে তার সব টাকা-কড়ি কাপড় চোপড় কিনতেই শেষ হয়ে যেত। এদিকে সেপাই-সান্ত্রীদের কি হাল হল তাই নিয়ে এতটুকু মাথা ঘামাতেন না। থিয়েটারে কিম্বা শিকারে যদি-বা যেতেন, তাও শুধু লোককে তাঁর নতুন পোশাক-আশাক দেখাবার জন্য। দিনের মধ্যে ঘড়ি-ঘড়ি তিনি সাজ বদলাতেন। অন্য রাজা-রাজড়ার বিষয়ে যেমন বলা হয়, 'মহারাজ মন্ত্রণাসভায় বসেছেন।' এঁর বিষয়ে তেমনি লোকে বলত, 'সম্রাট কাপড় ছাড়ার ঘরে বসে আছেন!'
মস্ত শহরে তাঁর রাজধানী, সেখানে আমোদআহলাদে লোকের সময় কাটত, কাজেই রাজসভায় নিত্যনতুন আগন্তুক আসত। একবার দুটো মহা দুষ্টু জোচ্চোর এসে বলল, তারা কাপড় বোনে, সে এমনি চমৎকার সব রঙের আর জমকালো
-
এক গরীব বিধবা ছিল। তার ছিল একমাত্র সন্তান, একটি মেয়ে, তাদের বংশে সব থেকে সুন্দরী। নাম তার মীরজান। এক গরমের দিনে গ্রামের মেয়েরা নদীতে স্নান করতে যাবে, মীরজানকেও ডাকল তারা। জলে নামল সবাই। মেয়েরা বলল: “তুই সত্যিই সুন্দরী, মীরজান! খান তোকে দেখলে বলতেন, ‘ও সুন্দরী মীরজান, তোমায় আমি আমার সর্বস্ব দিয়ে দেব, তুমি কেবল আমার হও!’”
মীরজান লজ্জায় চোখ নীচু করল: ‘তোমরা এমন ঠাট্টা করছ কেন, মেয়েরা? আমার দিকে খান ফিরেও তাকাবেন না। আমি যে গ্রামের মধ্যে সব থেকে গরীব।’
যেই সে একথা বলেছে হঠাৎ নদীর জল ফুঁসে উঠল আর নদীর গভীর থেকে কার যেন তেজী কণ্ঠস্বর শোনা গেল: ‘ও
-
অনেকদিন আগে এক সদাচারী জ্ঞানী লোক ছিল। তার তিন ছেলে ছিল। লোকে বলে: শিকারীর ছেলে তীরে শান, দেয়, দর্জির ছেলে কাপড় কাটে। জ্ঞানী লোকটির ছেলেরা ছোট বয়স থেকেই বিভিন্ন জ্ঞানবিজ্ঞানের বই পড়েই সময় কাটায়। তাদের মধ্যে বড় যে ভাই সে তখনও ঘোড়ায় উঠে বসতে পারে না আর ইতিমধ্যে বিচার, পরামর্শ করার জন্য লোক আসে ভাইয়েদের কাছে।
একদিন তাদের কাছে দুজন লোক এল দুটি উট আর একটি উটের বাচ্চা সঙ্গে নিয়ে ৷ তারা বলল: ‘আমাদের দু’জনেরই একটি করে উট আছে। উটদুটি সর্বদাই একসঙ্গে চরত মাঠে। কয়েকদিন আগে ওদের ফিরিয়ে আনতে গিয়ে দেখি দুটি সদ্যজাত উটশিশু, একটি জীবিত, অপরটি মৃত। এখন আমরা
-
একসময় এক বুড়ো কাঠুরে তার ন’বছরের মেয়েকে নিয়ে থাকত এক ভাঙা কুঁড়েঘরে।
থাকার মধ্যে ছিল কেবল তার একটা ভাঙা কুড়ুল, একটা খোঁড়া ঘোড়া আর বুড়ো একটা গাধা। কিন্তু কথায় বলে ‘ধনীর সুখ তার ঘোড়াগরুর পালের দিকে তাকিয়ে আর দরিদ্রের সুখ তার সন্তানদের দিকে তাকিয়ে।’ সত্যিই, নিজের ছোট্ট মেয়ের দিকে তাকিয়ে কাঠুরে সব দুঃখকষ্ট ভুলে যেত।
মেয়ের নাম আয়না-কিজ। সুন্দরী বুদ্ধিমতী আর হাসিখুশী স্বভাব তার, একবার তাকে দেখলেই ভালবেসে ফেলে তাকে সবাই। দূরের দূরের ইয়ুরতা থেকে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা আসে তার সঙ্গে খেলা করার জন্য, দূর দূর গ্রাম থেকে বৃদ্ধেরা আসে তার সঙ্গে কথা বলার জন্য। একদিন বুড়ো কাঠুরে খোঁড়া ঘোড়ার পিঠে
-
মানুষ যেমন, গুগলীও তেমনি হাঁটা-পথে চলে, কাজেই কৈলাস যাবার হাঁটা-পথের খবরই গুগলী রাখত। কিন্তু মাটির উপর দিয়ে হাঁটা-পথ যেমন, তেমনি আকাশের উপর দিয়ে জলের নিচে দিয়ে সব পথ আছে, সেই রাস্তায় পাখিরা মাছেরা দূর-দূর দেশে যাতায়াত করে। মানুষ, গরু, গুগলী, শামুক—এরা সব পাহাড়-জঙ্গল ভেঙে, নদী পেরিয়ে চলে, কাজেই কোথাও যেতে এদের অনেক দিন লাগে। মাছেরা এঁকে-বেঁকে এ-নদী সে-নদী করে যায়, তাদের ডাঙায় উঠতে হয় না, কাজেই তারা আরো অল্পদিনে ঠিকানায় পৌঁছয়। আর পাখিরা নদী-ডাঙা দুয়েরই উপর দিয়ে সহজে উড়ে চলে—সব চেয়ে আগে চলে তারা! কিন্তু তাই বলে পাখিরাও যে পথের কষ্ট একেবারেই পায় না, এমন নয়। আকাশের নানাদিকে নানা-রকম নরম-গরম
-
সুবচনীর খোঁড়া হাঁস এই সব বুনো-হাঁসদের দলে ভিড়ে উড়তে, আর এ-গ্রামের সে-গ্রামের সব সরাল, ঘেংরালদের দেখে হাসি-মস্করা করতে পেয়ে, ভারি খুশি হয়েছে। সে ভুলে গেছে যে নিজেই সে এত-কাল পালা-হাঁসই ছিল—ঐ সরাল-ঘেংরালের মতো ঘর আর পুকুর করে কাটিয়েছে। তার উপর সে আজন্ম-খোঁড়া, সবে আজ নূতন উড়ছে। বুনো হাঁসের সঙ্গে সমানে পাল্লা দিয়ে চলা তার কর্ম নয়! খোঁড়ার ডানার তেজ ক্রমেই কমছে আর দমও ক্রমে ফুরিয়ে আসছে, সে হাঁপাতে-হাঁপাতে তাড়াতাড়ি ডানা ঝাপটেও আর পেরে উঠছে না মধ্যে থেকে এক-এক-করে প্রায় আটহাঁস পিছিয়ে পড়েছে। সেথো হাঁসরা যখন দেখলে খোঁড়া পিছিয়ে পড়ে, আর পারে না, তখন পাণ্ডা-হাঁসকে ডাক দিয়ে জানালে—“চকা-নিকোবর, চকা-নিকোবর!”
চকা উড়তে-উড়তেই
-
মেঘনার মোহানায় চর যে কখন কোথায় পড়ে, তার ঠিক-ঠিকানা নেই। আজ যেখানে জল, কাল সেখানে দেখা গেল চড়া পড়ে বালি ধূ-ধূ করছে; কাল যেখানে দেখেছি চরে উলু-ঘাস, বালু-হাঁস; বছর ফিরতে সেখানে দেখলেম চরও নেই, হাঁসও নেই—অগাধ জল থৈথৈ করছে! এক-রাতের মধ্যে হয়তো নদীর স্রোত ফিরে গেল—জলের জায়গায় উঠল বালি, বালির জায়গায় চলল জল।
বাগদী-চরে হাঁসেরা যখন উড়ে বসল, তখন চরের চারদিকে জল—ডাঙা থেকে না সাঁতরে চরে আসা মুশকিল। অপার মেঘনার বুকে একটুকরো ময়লা গামছার মতো ভাসছিল চরটি, কিন্তু রাত হতেই জল ক্রমে সরতে লাগল, আর দেখতে-দেখতে সরু এক-টুকরো চড়া, ডাঙা থেকে বাগদীচর পর্যন্ত, একটি সাঁকোর মতো দেখা দিলে।
চাঁদপুরের জঙ্গলে
ক্যাটাগরি
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.