অসহযোগ আন্দোলনে খুলনা
১৯২০ সালের ডিসেম্বর মাস, জাতীয় কংগ্রেসের নাগপুর অধিবেশন। স্বাভাবিকভাবে দেশের যুদ্ধোত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর্যালোচনাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। জালিয়ানওয়ালাবাগে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে অসহযোগের প্রস্তাব পাশ হয়। ভারতে ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা অচল ক’রে দেওয়াই ছিল এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য। অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের মূল প্রবক্তা ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। আন্দোলন পরিচালনার ভার তাঁরই উপর দেওয়া হয়। আন্দোলনের কর্মসূচীতে বিশেষভাবে প্রাধান্য পায়—ব্রিটিশ আদালত ও কাউন্সিল বর্জন, স্কুল-কলেজ থেকে ছাত্রদের প্রত্যাহার, বিলাতী পণ্যদ্রব্য বয়কট ইত্যাদি। সারা ভারত জুড়ে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয় ১৯২১ সালের জানুয়ারী মাসে।
বাংলায় গান্ধীজীর প্রধান সহযোগী ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। নাগপুর থেকে ফিরে এসে তিনি ব্যারিস্টারি ছেড়ে আন্দোলনের পুরোভাগে এসে দাঁড়ান। তখন আইন-ব্যবসায়ে তাঁর মাসে উপার্জন ছিল ৪০,০০০ টাকা। তাঁর এই মহান ত্যাগের দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলার প্রতিটি জেলায় বিপুল সংখ্যক আইনজীবী আদালত বর্জন করেন। খুলনা জেলায় সর্বপ্রথম যে পাঁচজন উকিল আদালত বর্জন করেন, তাঁরা হলেন—যামিনীরজন মিত্র, ননীগোপাল রায়, দ্বিজরাজ ভট্টাচার্য, জ্ঞানদত্ত চৌধুরী ও খোন্দকার উকিলউদ্দিন (বাগেরহাট)। এই পাঁচজন উকিল আর কোনো দিনই আইন-পেশায় ফিরে যান নি। গান্ধীজীর আদর্শে তাঁরা জীবন-গঠনমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন।[১]ডুমুরিয়া থানার গোনাইল গ্রামের লালমোহন ঘোষ ওকালতি ছেড়ে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। পরে তাঁরই সম্পাদনায় কলকাতা থেকে সরকার-বিরোধী পত্রিকা ‘আত্মশক্তি’ প্রকাশিত হ’ত।[২]সরকারী চাকুরীতে ইস্তাফা দিয়েও বেশ কিছু ব্যক্তি অসহযোগ আন্দোলনে সামিল হন। লাহোর কলেজের অধ্যাপনার কাজ ছেড়ে দিয়ে খুলনায় এসে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন নৈহাটির শরৎচন্দ্র ঘোষ। উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী ক্ষীতিষ বসুও (খুলনা শহর) চাকরী ছেড়ে আন্দোলনে যোগ দেন। পরে রাচিতে সমাজ-সেবা ও গঠনমূলক কাজের মধ্যেই তাঁর জীবন অতিবাহিত হয়।[৩]
কমিটির জেলার সর্বত্র আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য জেলায় স্থায়ী কংগ্রেস কমিটি গঠিত হয়। জেলা-কংগ্রেসের প্রথম প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারী নির্বাচিত হন যথাক্রমে উকিল নগেন্দ্রনাথ সেন ও উকিল ননীগোপাল রায়।[৪]অন্যান্য বিশিষ্ট সদস্যদের মধ্যে জ্যোতিষচন্দ্র ঘোষ, যামিনীরঞ্জন মিত্র, দ্বিজরাজ ভট্টাচার্য, ডাক্তার নগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য প্রমুখ। অসহযোগ আন্দোলনের সময় (১৯২১) খুলনার সাতক্ষীরা অঞ্চলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের নির্দেশে খুলনা-কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ, বিশেষ ক’রে নগেন্দ্রনাথ সেন ও জ্যোতিষচন্দ্র ঘোষ ঐ অঞ্চলে গিয়ে তিন মাস ধরে ত্রাণকার্য পরিচালনা করেন। স্থানীয় কর্মীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সাতক্ষীরার উকিল জিতেন্দ্রনাথ মিত্র।[৫]
স্কুল-কলেজ-বর্জনের যে প্রস্তাব নাগপুর কংগ্রেসে গৃহীত হয়েছিল, তারই সূত্র অনুসরণ ক’রে ১৯২১ সালের ১২ই জানুয়ারী কলিকাতায় ছাত্র-দিবস পালিত হয়। ওয়েলিংটন স্কোয়ারে বিশাল এক ছাত্র-সমাবেশে দেশবন্ধু উদাত্ত কণ্ঠে ছাত্রদের নিকট আহ্বান জানালেন—“গোলামখানা ছেড়ে দাও” এবং আরও ঘোষণা করলেন—“Education may wait but Swaraj cannot.” এরপর ছাত্রসমাজ ব্যাপকভাবে স্কুল-কলেজ বর্জন করে শুধু কলকাতায় নয়। বাংলাদেশের সব জেলায়। খুলনাতেও বহু ছাত্র স্কুল-কলেজ ছেড়ে অসহযোগ আন্দোলনে সামিল হয়, জেলার আন্দোলনে তীব্র গতির সঞ্চার হয় ছাত্রদের সহযোগে।
ওয়েলিংটন স্কোয়ারের ঐ ঐতিহাসিক ছাত্র-সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন মূলঘর গ্রামের জ্ঞান ঘোষ। তিনি তখন বিদ্যাসাগর কলেজে প্রথম বার্ষিক শ্রেণীর ছাত্র। এ প্রসঙ্গে শ্রদ্ধেয় জ্ঞান ঘোষ স্মৃতিচারণ করেছেন—“ওই বিরাট ছাত্র মিটিং-এ দেশবন্ধু মর্মস্পর্শী ভাষায় বলেন, ‘আপনারা কি আমাকে দেশের জন্য ভিক্ষা দেবেন না? স্কুল-কলেজ ছেড়ে এসে কি আমার পাশে দাঁড়াবেন না, দেশের স্বাধীনতার জন্য?’ তারপর কলকাতার স্কুলে-কলেজ একদিনেই ফাঁকা হয়ে গেল। সেদিন আমিও ব্রত নিলাম—আর কোনো দিন কলেজে ফিরে যাইনি।”[৬]খুলনার অনেক ছাত্রই তখন কলকাতায় পড়াশুনা করতেন, তাঁরাও জ্ঞানবাবুর মতো কলেজ বর্জন ক’রে আন্দোলনে সামিল হন। এদের মধ্যে ছিলেন সেনহাটীর প্রফুল্লচন্দ্র সেন (পরবর্তীকালে আরামবাগের গান্ধী নামে পরিচিত হন এবং ১৯৬২-১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রীর পদে আসীন ছিলেন); ব্রাহ্মণরাজদিয়ার শিবনাথ ব্যানার্জী
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments