অন্ধকার জলে ডুবুরী
লেখক: রিয়ার-অ্যাডমিরাল সের্গিয়েই পাভিচ্ জুয়েল্কো
জাহাজ উত্তোলনের জন্য বরাদ্দ ছ'টি বিশেষ স্থানে পরিকল্পনা মাফিক সব কাজ এগিয়ে যাচ্ছিল এবং সেগুলো সময়মতো সম্পন্ন করার আত্মবিশ্বাসও আমাদের ছিল। ডুবুরীরা স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে এবং দিনে যতটা সময় কাজ করা সম্ভব তার পুরোটাই সদ্ব্যবহার করেছে। দিন-রাত একের পর এক ডুবুরী পানিতে সমানে ওঠা-নামা করেছে। এখানে আবারো বলতে হয়, ছোট-বড়ো কোনো কাজেই বন্দরের কর্মক্ষমতা হ্রাস পায় নি যদিও তাতে আমাদের কাজের গতি ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছিল। তবে আমরাও বন্দর সচল রাখার ব্যাপারে সতর্ক ছিলাম, যে-কারণে বন্দরে জাহাজ আসা-যাওয়ার সময়সূচি পরীক্ষা করে যে সময়ে সবচেয়ে কমসংখ্যক জাহাজ আসে সে সময়টুকুতেই কাজ করতাম।
মে মাসের টানা বৃষ্টি আর কালবৈশাখী আমাদের কাজ যথেষ্ট ব্যাহত করেছিল। কমপক্ষে এক সপ্তাহ আমরা নিষ্কর্মা হয়ে বসে ছিলাম। তবে তাতে আত্মবিশ্বাস কমে যায় নি। পানি ও বাতাসের উষ্ণ তাপমাত্রার কারণে ডুবুরীদের গরম পোশাক ব্যবহার বাতিল করা হয়েছিল। এবং তার জায়গায় বরাদ্দ করা হয়েছিল হালকা সিন্থেটিক কাপড়। কর্ণফুলীতে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জেনেছিলাম, ডুবুরীদের অক্সিজেন ব্যবস্থায় কেবল ১২ থেকে ১৫ মিটার গভীরতায় কম্প্রেসর ব্যবহার করা চলে। গভীরতা এর চেয়ে বেশি হলে অক্সিজেন এতটাই গরম হয়ে পড়ে যে কয়েকজন ডুবুরী অচেতনও হয়ে পড়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে এমনকি ফ্রিজিং প্রক্রিয়াও কাজ করে না। বরং অক্সিজেন ট্যাঙ্ক ব্যবহার করলে ডুবুরীরা ১৮ থেকে ২০ মিটার গভীরতা পযন্ত নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারেন।
যে-কোনো ডুবন্ত বস্তু উপরে তুলতে সবচেয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ায় পলিমাটির আস্তরণ। জাহাজের বডির নিচে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার সময়ে পলিমাটি দ্রুত অপসারণ করা সম্ভব, কিন্তু কাজে ঢিলে দিলেই স্রোতের কারণে দ্রুত পলিমাটি চলে আসে। স্রোতের টানে চলে আসা পলিমাটি জাহাজের খোলের ভিতরে একবার ঢুকে গেলে ভিতরে স্রোত না থাকায় বসে যায়। ৩/৪ দিনের মধ্যেই তা জাহাজের ভিতরকার অধিকাংশ কক্ষের ৮০/৯০ শতাংশ ভরে ফেলে। পরে এমন জাহাজ তোলার চেষ্টা করলে ভার তার দু থেকে আড়াই গুণ বেশি হয়ে যায়। উপরন্তু নদীর তলদেশ অত্যন্ত ঢালু হওয়ায় ডুবন্ত জাহাজগুলোর বেশির ভাগই ৯০০ থেকে ১০০০ ডিগ্রি পর্যন্ত হেলে থাকে। তখন সেগুলো তোলা আরো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
জাহাজের খোলের ভিতরে তাদের ইঞ্জিনের তেল ও গ্রিজের কণা পানিতে ঘূর্ণিপাক খেতে থাকে, যাতে ডুবুরীর পোশাকের রাবারের অংশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ডুবুরীদের অধিনায়ক ১ম র্যাঙ্কের ক্যাপ্টেন ভাদিমির বন্দারেক্কো আমাকে এ ব্যাপারে জুনের প্রথম দিকে সাবধান করে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন খুবই অভিজ্ঞ ডুবুরী যিনি বিভিন্ন সময়ে পানির বিভিন্ন গভীরতায় কাজ করায় অভ্যস্ত ছিলেন। আমাদের নৌবহরে তিনি ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র। ডুবে-থাকা জাহাজ সম্পর্কে তিনি যে রিপোর্ট দিতেন সেটিই চূড়ান্ত বলে গণ্য হত। এরকম জাহাজ যেন অন্ধকার ঘরে এক কালো বিড়াল, তার বৈশিষ্ট্য বিষয়ে কিছুই জানা যায় না। 'সোনার তরী'কে ওঠানোর জন্য পাকাপাকি পরিকল্পনা করার আগে ডুবুরীরা তাকে অনেকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন জাহাজটি কীভাবে শুয়ে আছে, খোলে ফাটল আছে কিনা, ভিতরে মালপত্র আছে কিনা, খোলের ভিতর সাঁতরিয়ে ঢোকা যাবে নাকি হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হবে। পর্যবেক্ষণের সময়সীমা আরো দীর্ঘতর হচ্ছিল যেহেতু সর্বোচ্চ দেড় নটিক্যাল মাইল স্রোতে ডুবুরীর পক্ষে কাজ করা সম্ভব ছিল, কিন্তু তা দিনে সাড়ে চার ঘণ্টার বেশি নয়।
জোয়ার-ভাঁটার পার্থক্য ধরার জন্য আমরা পরবর্তী পদ্ধতি কার্যকর করেছিলাম। একটা নির্দিষ্ট গভীরতায় ভাসমান সিগন্যাল বা সঙ্কেত বসানো হল। যদি ঐ সঙ্কেত পানির নিচে তলিয়ে যায়, তো বুঝতে হবে পানির স্রোতের তোড় ডুবুরীকে খোলা সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যাবার মতো বিপজ্জনক। ফলে, ডুবুরীকে তখন পানির নিচে পাঠানো যাবে না। সঙ্কেত পানির ওপরে ভেসে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments