গান
শীলাবতী যেন অপূর্ব সুন্দরী হইয়া উঠিয়াছে—বিশেষত আজিকার দিনটিতে। এক বছর ধরিয়া অশোক তাহাকে দেখিয়াছে, আজও দেখিল। দেখিল শীলাবতী ঘামিয়া উঠিয়াছে; কপালে, সরু চিবুকে, গলার নীচে, বুকের কাছটিতে ছোটো ছোটো ঘাম-বিন্দু। ডান হাতটি ছন্দোবদ্ধ ভঙ্গিতে লীলায়িত, গালের পাশে অবিন্যস্ত উড়ো চুল।
রান্নাঘর। একপাশে একটি মাত্র জানালা—অপরিসর; সারাটা ঘর একটু আগেও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ছিল, এখনও আছে, কিন্তু গভীরতায় অল্প।
অশোক দুই হাত তুলিয়া বলিয়া উঠিল:
—‘আহা দেখেছ, সব নষ্ট করে দিলে, সব নষ্ট করে দিলে। অমন মাছটা আর খেতে পেলাম না।’
খুন্তি নাড়িতে নাড়িতে, হাসিয়া শীলাবতী বলিল: ‘আহা! নিজের চরকায় তেল দাওগে বাপু, রান্নাঘরে কেন পুরুষের ঝকমারি! টাকা যদি তোমরা আনতে পার, রাখবার উপায়টা আমরা জানি, তোমরা নও। তোমরা যদি গাছ—মানে কাঠ কাটতে পার, আমরা জ্বালাতে পারি আগুন।’
—‘এবং জ্বালিয়ে জ্বালিয়ে দিব্যি আরামে, পায়ের পর পা তুলে ঘুমোও। ওদিকে তো পুরুষের দোকানে ঘিয়ের বাতি।’
হাসি চাপিয়া শীলাবতী যেন হঠাৎ গম্ভীর হইয়া ওঠে। বলিল: ‘তাই নাকি? তাহলে উপায়?’
অশোকও গম্ভীর হইয়া বলিল: ‘এক কাজ করো। কিছুদিন তোমরাই এখন দোকান সাজাও; আমরা ঘরে এসে বসি।’
খিল খিল করিয়া হাসিয়া ওঠা শীলবতীর অভ্যাস। হাসির বেগে চোখ দুইটি ছোটো হইয়া আসে, গাল ফুলিয়া ওঠে, চিবুকের ওপর কয়েকটি রেখার দাগ পড়ে।
অশোক তাহার দিকে খানিকক্ষণ চাহিয়া রহিল। খুশির প্রাবল্যে শীলাবতীর মুখখানা কী রকম হইয়া আসে দেখিয়া তৃপ্তি অনুভব করে। তারপর অকস্মাৎ গম্ভীর হইয়া গেল, দারুণ গম্ভীর।
দুইজনেই চুপচাপ; কেবল খুন্তি ঠুং ঠাং শব্দ, তার সঙ্গে হাতের চুড়িতে অনুচ্চ আওয়াজ।
ঘাড় কাত করিয়া গালটা একপাশে উঁচাইয়া ধরিয়া শীলাবতী ভুরু কুঁচকাইয়া বলে: ‘কী হল?’
—‘কেবলই মনে হচ্ছে, কালকেই যে চলে যাব।’
—‘হ্যাঁ।’ শীলাবতী মুখ নিচু করিয়া নিল।
—‘হ্যাঁ মানে?’
—‘একেবারেই সোজা কথাটি। মানে, আবার আসবে।’
—‘আসব।’—যেন অশোকের মতো জলমগ্ন প্রায়-হতভাগ্য একটা ভাসন্ত তৃণ দেখিতে পাইয়াছে।
শীলাবতী মাথা নাড়িয়া বলিল। ‘হ্যাঁ, শীতের ছুটিতে।’
—‘ও, এই কথা? সে তো আমিও জানি।’—অশোকের চোখে-মুখে যেন হতাশার চিহ্ন।
শীলাবতী এবার নিজের সঙ্গে কথা বলে: ‘তোমার কিন্তু মজা মন্দ নয়; শহরে থেকে গাড়ি-ঘোড়ায় দৌড়াও, কত কিছু দেখ, কত কিছু খাও, আবার মুখের-চোখের স্বাদ বদলাতে চলে এস গাঁয়ে। কী মজা।’
অন্য সময়ে হয়তো অশোক হাসিমুখে অন্য কথাই বলিত, যোগ্য উত্তর দিত। কিন্তু এখন তেমনই গম্ভীরভাবে, ঝুঁকিয়া পড়িয়া বলিল: ‘তুমি আমার সঙ্গে যাবে, শীলা?’
শীলাবতীর মুখ ঘুরিয়া আসিল; ‘কোথায়?’
—‘যেখানে কত কিছু দেখি, কত কিছু খাই।’
তৎক্ষণাৎ মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়া গেল: ‘ছি’।
তাহার কাঁধে হাত রাখিয়া অশোক বলিল, ‘ছিঃ কেন?’
—‘পাগলামি কোরো না। তোমার মা নেই? বোন নেই? তারা মানুষ নয়। তারা এখানে পড়ে থাকবে—আর আমাকে একলা নিয়ে যাবে তুমি?’
অশোক হাত সরাইয়া নিল। চুপ করিয়া সামনের উঠানের দিকে তাকাইয়া থাকা ছাড়া গত্যন্তর কোথায়? কিছুক্ষণ পরে আবার কী মনে করিয়া নিজেই বলিল:
—‘আমার দোষ? তুমিই তো বললে।’
—‘বললাম বলেই বুঝি যেতে চাইলাম?’ শীলবতী সশব্দে হাসিয়া উঠিয়া বলিল: ‘হা ঈশ্বর! সে কথা তুমিও জানতে, ওটা পাগলামি। তবু তো বললে, বলে আবার নিজেই দুঃখ পেলে! না বাপু, অমন হাঁড়িপনা মুখ আমি সইতে পারিনে, অত রাগ আমি ভালোবাসিনে।’—এই বলিয়া সে একটু পিছন ঘুরিয়া অশোকের ডান হাতটি নিজের হাতে নিল। মুখ নিচু করিয়া নিজের বুকে চাপিয়া ধরিল।
তারপরেই খিল খিল করিয়া দুজনেরই উচ্ছ্বসিত হাসি। এমন সময় বাহিরে দ্রুত পদশব্দ এবং কাশি। সঙ্গে সঙ্গে ডাক: ‘ভূতো, ভূতো?’
নিমেষমধ্যে হাত ছাড়িয়া দিয়া স্খলিত ঘোমটা মাথায় তুলিয়া শীলাবতী রান্নায় মন দিল। যেন ভালো মানুষটি।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments