নরেন ভট্টাচার্য থেকে মানবেন্দ্র নাথ রায়
লেখক: এস এম আজিজুল হক শাজাহান
২৪ পরগণা জেলার আড়বেলিয়া গ্রামের বসন্তকুমারী দেবী ও দীনবন্ধু ভট্টাচার্যের দ্বিতীয় সন্তান নরেন ভট্টাচার্য, পরবর্তীকালে যিনি মানবেন্দ্রনাথ রায় নামে পরিচিত, তাঁর সমস্ত জীবনটাই ছিল একটি ঘূর্ণিঝড়। ঝড়ের পাখী (আলব্যাট্রস্য)’র মতই ছিল তাঁর জীবনকাল। মানব মুক্তির জন্য প্রায় গোটা পৃথিবী মন্থন করে পৃথিবীর জ্ঞান ভান্ডারকে অজস্র মনিমুক্তায় সমৃদ্ধ করে পরিশেষে অকস্মাৎ দেরাদুনের ছোট্ট একটি নীড়ে সেই পাখীর পাখার ঝাপটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, শুদ্ধ হয়ে যায় তাঁর প্রাণ প্রদীপ। সে আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর পূর্বের কথা—১৯৫৫ সালের ২৫শে জানুয়ারী। তিনি যখন মারা যান তখন তিনি ভারতের রাজনীতিতে ছিলেন প্রায় সম্পূর্ণ পরিত্যাক্ত—স্তব্ধ বিসুভিয়াসের মত। আজ উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মানবেন্দ্র নাথ রায়—একটা বিস্মৃতপ্রায় নাম।
এম, এন, রায় সম্পর্কে ভারতের প্রখ্যাত বিপ্লবী চিন্তাবিদ, সাপ্তাহিক ‘কম্পাসের’ সম্পাদক, শ্রদ্ধেয় পান্নালাল দাসগুপ্ত তাঁর পত্রিকার শারদীয় সংখ্যার ১০০ পৃষ্ঠায় লিখেছিলেন, ‘এক মানুষের কথা—যাঁর জীবন কাহিনী অনেকের কাছেই গল্পের মত মনে হয়।’ ১৯৫৪ সালে রায়ের পরলোক গমনের পর কোলকাতার ‘দৈনিক স্টেটম্যান’ পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদকীয় লেখক, কবি সুধীন দত্ত লিখেছিলেন, ‘মানবেন্দ্রনাথের জীবন যেকোন জীবনীকারের পক্ষে এক অপূর্ব উপাদান। এদেশের দুর্ভাগ্য যে, মানবেন্দ্র নাথ রায় তাঁর স্বদেশবাসীর পক্ষে অনেক আগে জন্মগ্রহণ করেন, তাঁর বক্তব্য বুঝতে কিছু সময় লাগবে।’
রায় যাকে মা বলে ডাকতেন সেই বিদুষী মহিলা সরলা বালা সরকার একদিন রায়কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেন রায় তাঁর পৈত্রিক নাম পরিবর্তন করলেন? রায় হাসতে হাসতে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘নরেন আর মানবের মানে তো একই, মানবেন্দ্র নামটিও বেশ জমকালো নয় কি? আর ভট্টাচার্যে আমার অরুচি হয়ে গেছে, তাই ভট্টাচার্যকে রায় করে নিয়েছি।’
নরেন ভট্টাচার্যের মনটা ছিল জন্ম থেকেই দেশপ্রেমে ভরপুর। কিশোর বয়স থেকেই তাঁর মধ্যে বিপ্লবী স্বদেশী কর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের ভাব পরিলক্ষিত হয় এবং বিপ্লবীদের কর্মকান্ড তাঁকে অনুপ্রাণিত করে তোলে। এর ফলশ্রুতিতে তিনি বিপ্লবী যতীন্দ্র নাথ মুখোপাধ্যায়ের সংস্পর্শে আসেন ও তাঁর মেধা এবং ব্যক্তিত্ব নরেনকে প্রভাবিত করে। পরে নরেন তাঁকেই বিপ্লবের ‘গুরু’ বা ‘দাদা’ হিসেবে গ্রহণ করে দেশ-মাতৃকার বন্ধন মুক্তির জন্য বিপ্লবী আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন। ইংরেজদের সাথে ‘বালেশ্বরের লড়াইয়ে’ বাঘা যতীনের অকাল তিরোধানে নরেন বজ্র শপথ নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ইংরেজদের হঠানোর জন্য বিদেশে অস্ত্র সংগ্রহের জন্য পৃথিবীর এক দেশ থেকে অন্য দেশে ফাঁসীর দড়িকে গলায় বেঁধে নিয়ে পদে পদে মৃত্যুর ঝুঁকির সম্মুখীন হয়ে শেষ কালে ‘রেভারেন্ড চালর্স মার্টিন’ এ ছদ্ম নামে আমেরিকার সানফ্রানসিসকো শহরে উপস্থিত হন। এ শহরের নিকটবর্তী প্যালেএ্যান্টো শহরের স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে তখন ধনগোপাল বাস করতেন। ধনগোপালের ভাই ডা. যাদুগোপাল ছিলেন রায়ের বিপ্লবী বন্ধু। তখন আমেরিকায় ভারতের বিপ্লবী দলের ফেরারী আসামী হিসাবে পুলিশ গ্রেপ্তারী পরোয়ানা নিয়ে নরেনকে খুঁজছিল। এ সময় ধনগোপালের নির্দেশে নরেন তাঁর পৈত্রিক নাম বাদ দিয়ে মানবেন্দ্রনাথ রায় রাখেন। সেদিন থেকেই জন্মসূত্রে পাওয়া নামটি হারিয়ে যায়; এম. এন. রায়ই ইতিহাসে স্থায়ী স্থান দখল করে বসে।
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে এবং আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে মানবেন্দ্র নাথের অবস্থান কোথায় এবং কোন স্থান আছে কি-না এ বিষয় শ্রী সমরেন রায় রচিত ‘মানবেন্দ্র নাথ ও আন্তর্জাতিক কমিউনিজম’ এবং ‘দ্য রেস্টলেশ ব্রাহ্মিণ’ (অশান্ত ব্রাহ্মিণ) নামক গবেষণা মূলক গ্রহদ্বয়ের আর্শিবাদ নামায় ড. যাদুগোপাল এক জায়গায় লিখেছেন, “আমার কাছে নরেন ভট্টাচার্য একটি অত্যান্ত প্রিয় নাম। বর্তমানে রাজনীতির ছাত্রদের সেই সময়কার বৈপ্লবিক আন্দোলনের নেতাদের বিষয় যা এখন ইতিহাসে পরিণত হয়েছে, তা ভাল করে অনুধাবন করা প্রয়োজন। বৈপ্লবিক আন্দোলনে নরেন একজন অত্যন্ত বৈচিত্রময় ব্যক্তি এবং নেতা ছিল। নরেনের সাংগঠনিক দক্ষতাও ছিল
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments