মুখোস
এক একটা দিন আসে, এমন প্রায়ই দেখা যায়, যখন কিছুই ভালো লাগে না। এমন কি এ রকমও হয়, মরে যেতে ইচ্ছে করে। লোক চক্ষুতে ধরা পড়ে মুখের পদার্থই বেশি। তাদের স্থান মনের ক্ষেত্রে নয়। কাজেই সেখানে যা ঘটে তা নিজেরই ব্যাপার, অন্যে কখনও জানতে পারে না।
অর্থাভাবই দুঃখের একমাত্র কারণ নয়, আবার প্রচুর অর্থানুকূল্যই কেবল মানসিক সুখ ঐশ্বর্যের বাহন নয়। তাহলে কলকাতার খ্যাতনামা ধনী দীপক সেনের কেন আজ ভালো লাগবে না?
অথচ বাইরের চর্ম্ম চক্ষুতে শুধু এই প্রতীতি রয়েছে, তাঁর মতো সুখী এই অভাব—উষ্ণ পৃথিবীতে বিরল। কারণ তার বিস্তর অর্থ আছে, বয়স অল্প, ভালো চেহারা, মাথার ওপরে রক্তচক্ষু নেই, আত্মীয় স্বজনেরও বালাই নেই, এমন কি স্ত্রী পর্যন্ত নেই, আছে প্রকাণ্ড গাড়ি, বাগানওয়ালা মস্ত বাড়ি, অনেক দাস দাসী। এর পরেও কি করে যে সুখের স্থান অপূর্ণ থাকে, সেটাই মানুষের কাছে পৃথিবীর অন্যতম আশ্চর্য।
কিন্তু আসলে যত বড়ো আশ্চর্যই হোক না কেন দীপকের আজ সত্যি ভালো লাগছে না। হাতের কাছে অত সুখোপকরণ থাকতেও তার মনের কোথায় যেন মধ্যাহ্নের মাঠের মতো আগুনের তাপ পেয়েছে, ধূ ধূ করছে, গরম হাওয়া বইছে।
এর আগে সে বসে বসে একটা বই পড়ছিলো। উপন্যাস; কতগুলো আলোময়, ঝক্ঝকে দিন, নৈনির পাহাড়ে পাইনের নীচে দুটি প্রাণবন্ত জীবনের আনন্দ কলোচ্ছ্বাস, তাদের অবিশ্রান্ত তীক্ষè কাথাবার্তার তালে আইনের মর্মর-ধ্বনি, ঝরনার দুর্বোধ্য শব্দ। এসব দীপকের চোখে স্বপ্নাঞ্জন একে দিলে। কিন্তু বাইরে থেকে এক ঝলক বাতাস আসার স্পর্শে যখন নিষ্ঠুর পারিপার্শ্বিক মাথা তুললো, তখন সে বিরক্ত হয়ে বইটি হাতের কাছে শেলফে রেখে দিলে। ঠিক সুমুখে নয়, একটু কোণাকুণিতে পুরু কাচের টেবিল, তার ওপর নীল সেড দেওয়া চক্চকে বৈদ্যুতিক বাতি। দীপক সেদিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলো।
সন্ধ্যা হতে এখনও কিছু বাকী আছে।
সে চেয়ার থেকে উঠলো, উঠে কার্পেট পাতা মেঝেতে পায়চারি করতে লাগলো। পদচারণার গতি অলস, খাপছাড়া ভাবে পড়ে, সামঞ্জস্য নেই।
দীপক জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো; পশ্চিমের আকাশে নানা রঙের উৎসব, রঙিন মেঘের ছড়াছড়ি, শান্ত, নরম আলো।
কিন্তু তার আজ এসব মোটেই ভালো লাগলো না, ধীরে ধীরে সে সরে এলো সেখান থেকে, আবার কি জানি কেন ঘরের ঠিক মাঝখানে বজ্রাহতের মতো একভাবে দাঁড়িয়ে রইলো।
পায়ের শব্দের সাথে সাথে দরজার সবুজ পর্দা গেল সরে, সন্ত্রস্তভাবে ঢুকলো বদরি। অন্যদিন এর আগে দীপক বেড়াতে বেরয়, আজ এখনও বেরয়নি এই দেখে চাকর এসেছে খবর জানতে।
দীপক বললে, কিরে বদ্রি?
আজ বেড়াতে যাবেন না, হুজুর?
সে চমকে উঠলো, বললে, নিশ্চয়ই যাবো। ড্রাইভারকে গাড়ি বার করতে বলগে যা, আমি আসচি।
আচ্ছা, হুজুর।
দীপক ব্যস্ত হয়ে উঠলো। কিন্তু টাওয়েল হাতে বাথরুমে ঢুকতে মনে হলো, আর কোথায়ই বা যাবে বেড়াতে? গড়পার পুরানো হয়ে গেছে, সিনেমার কল্পিত, অস্বাভাবিক কাহিনী ভালো লাগে না, শহরের কিছু বাইরে গিয়ে এমনভাবে হাওয়া খেয়ে আসতেও ভালো লাগবে না, আর শহরের কোলাহল এই প্রকার চেয়েও বিরক্তিকর।
সে আবার আগের মতোই হয়ে গেল, কি করবে ভেবে পেলো না, কোথায়ই বা যাবে? অথচ এদিকে সন্ধ্যে হতে বেশি বাকী নেই।
নিজের ওপর দীপকের ভয়ানক রাগ হচ্ছিলো, সে নিজেই যেন ওই অবস্থার জন্য দায়ী। টং টং ঘড়ি বেজে উঠলো, প্রতি ঘরের দেয়ালে শব্দ বেজে উঠলো, প্রতিধ্বনিতেও ছয়টা বেজেছে।
দীপক এবার মনের চোখ দু’টো যেন জোড় করে হাত মুখ ধুয়ে নিলো, কাপড় জামা পরলো, খাবার তৈরিই ছিল, তা খেয়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে গেল। বাইরে সিঁড়ির কাছে গাড়ি অপেক্ষা করছে, ড্রাইভার দরজা মেলে ধরলো, দীপক তাড়াতাড়ি উঠে বসে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments