চৈত্রদিনের এক দ্বিপ্রহরে

‘ওমা, আমি ভেবেছিলুম এ ঘরে বুঝি কেউ নেই; যা অন্ধকার—কিছু দেখা যায় না।’ শুনে নিরন্ধ্র অন্ধকারে আনোয়ার হাসলে, বোধ হয় কথাটা মিথ্যে বলে; চোখ মেলে অন্ধকারের মধ্যে আবছা সাদা বস্তুর পানে তাকিয়ে বললে: ‘আলাপ করবে? উঁ? করবে-তো ওঘর হতে আলোটা নিয়ে এসে বস।’

‘আলো?...তা…’ ছালেহা ইতস্তত করে থেমে গেল। আনোয়ার উঠে দাঁড়ালে অন্ধকারের মধ্যে অন্ধের মতো হাতড়ে হাতড়ে একটা অর্ধদগ্ধ মোমবাতি খুঁজে বের করল, জ্বালাতে-জ্বালাতে, বললে: ‘বুঝেছ? মাঝে মাঝে একেবারে ভুলে যাই আমাদের বাড়িতে শুধু একটি আলো। মুসলমানদের এ-ধরনের ভুল প্রায়ই হয়ে থাকে, এবং সেইখানেই সবচেয়ে বড় দুঃখ।’

ছালেহা কিছু বললে না; আনোয়ারের ছেঁড়া-নোংরা মাদুরের এক প্রান্তে নিঃশব্দে বসল। কয়েক মুহূর্ত নির্বাক থেকে মৃদুকণ্ঠে প্রশ্ন করলে: ‘অন্ধকারে চুপচাপ কী ভাবছিলেন বলুন তো?’

‘কী ভাবছিলাম...?’ থেমে আনোয়ার হাসল, বলল: ‘এ রকম প্রশ্ন কখনো কাউকে কোরো না, এতে সাধারণত নির্বুদ্ধিতা প্রকাশ পায়।...তাছাড়া, যারা গরিব, দুঃখী, নিঃসহায়, তাদের অমন কথা জিজ্ঞেস করলে তারা মনে-মনে লজ্জা পেয়ে থাকে, এবং উত্তরে তাদেরকে অর্থহীন মিছে কথা বলতে হয়।’

লজ্জা ছালেহাই পেল। লজ্জা-মিশ্রিত মৃদু হাসি হেসে মাথা নত করলে।

‘তবে, বোধ হয় আমার নিজের কথাই ভাবছিলুম। আচ্ছা ছালেহা, আমি যে নিতান্ত গরিব, এতে আমি কেন নিজেকে এতটা সৌভাগ্যবান বলে মনে করি জান? কারণ, গরিব বলে আমার চোখ দুটি উন্মুক্ত, প্রসারিত। দুঃখে-দারিদ্র্যে নিপীড়িত মুসলমানরা একটা আবছা আকাঙ্ক্ষা ও মিথ্যে মায়ায় ভুলে সর্বদা উন্মত্ত ও অস্থির হয়ে থাকলেও তারা জানে তারা কী; কী অবস্থা তাদের; কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ যদি হঠাৎ অর্থের নাগাল পায়, তখুনি সে জগতের বাস্তব আকৃতির কথা ভুলে যায়, ভুলে যায় যে সে মুসলমান। আমি বেঁচেছি; আমি সত্যি সৌভাগ্যবান।’


আজকের যে-মুসলমানরা, যারা সমাজের চোখে হেয়, অপমানিত, লাঞ্ছিত—তাদের প্রত্যেকের পেছনে একটা বিগতকরুণ ইতিহাস রয়েছে। তারা যে কেন এই নিষ্ঠুর অত্যাচার ও নিপীড়ন নীরবে সহ্য করছে, তা বাইরের লোক কী বুঝবে? তাদের নির্বোধ সরল চাহনি যেন সহ্য করা যায় না।


ছালেহা কথা বললে না; আনোয়ারের দারিদ্র্যের কথা উঠলে সে নির্বাক থাকে, চোখ নত করে রাখে।

‘শুনেছ, আজ সকালে আমাদের পাড়ার হামিদ আলি মারা গেছে।’

‘কে? সেই গাড়োয়ান?’

‘হুঁ। লোকটা গাড়ি চালাত। ...তার বাড়ির লোকদের সান্ত্বনা দিতে গিয়েছিলুম... তাদের পানে তাকিয়ে তাকিয়ে একটা কথা মনে হল। যা আমার মনে হয়, তা বলছি। তার আগে তুমি বল তো, আমাদের মুসলমান বিড়িওয়ালা, পানওয়ালা গাড়োয়ান ভাইদের দেখে তোমার কী ধারণা হয়?’

‘ঠিক ধারণা বলতে কিছু হয় না, তবে তাদের দেখে দুঃখ হয়, কান্না পায়।’

‘পাওয়া স্বাভাবিক। যাদের হৃদয় আছে তারা চিরকালই পাবে এবং তোমার তাদের সম্বন্ধে কোনো সুষ্ঠু ধারণা না জন্মালেও অন্তরে-অন্তরে তুমি তাদের ঠিক চিনেছ। সে-চেনাই বড় জিনিস।...তাদেরকে অনেকেই চেনে না; অনেকে বলে, তারা সুখী। কিন্তু কী জান তাদের বিশৃঙ্খল জীবন যেন একটা বিরাট যন্ত্রণাদায়ক দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে কাটে, একটা জ্বালাময় মর্মযাতনা তাদের তিলে তিলে ধ্বংস করে। পূর্বস্মৃতি, বর্তমান হীন জঘন্য অবস্থা, ভবিষ্যতের অর্থহীন আশা-আকাঙ্ক্ষা এ-সবের মধ্যে তারা ভীষণ দোলা খেতে থাকে। অতৃপ্ত বাসনা--কামনা, অতৃপ্ত বুভুক্ষার তাড়নায় দুঃস্বপ্নের তীব্র ঝাঁঝালো নেশায় তারা অহর্নিশি আচ্ছন্ন থাকে। তারা যে কী, সে-কথা তারা ভুলতে চেষ্টা করে, তাই তাড়ি খায়, সস্তা রংবেরঙের সিল্কের জামা পরে। যার ওপর ন্যায্য অধিকার ছিল, তা’ থেকে তারা নিষ্ঠুরভাবে বঞ্চিত হয়েছে; নিজের সাথেই ছলনা করা ছাড়া তাদের যেন আর অন্যপথ নেই।...তাদের দেখে তোমার কান্না পায়, আমার সারা শরীর জ্বালা করে ওঠে। জ্বালা করে তারা অক্ষম বলে, নিজকে নিজে ফাঁকি দেয়

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

আজকের কুইজ

[কুইজে অংশ নিয়ে জিতে নিন এক মাসের ফ্রি সাবক্রিপশন]

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice