সংসার
উপেন ভটচাজের পুত্রবধূ বেশ সুন্দরী। একটিমাত্র ছোটো ছেলে নিয়ে অত বড়ো পুরোনো সেকেলে ভাঙা বাড়ির মধ্যে একাই থাকে। স্বামীর পরিচয়ে বউটি এ গ্রামে পরিচিতা নয়, অমুকের পুত্রবধূ এই তার একমাত্র পরিচয়। কারণ এই যে স্বামী ভবতারণ ভটচাজ ভবঘুরে লোক। গাঁজা খেয়ে মদ খেয়ে বাপের যথাসর্বস্ব উড়িয়ে দিয়েছে, এখন কোথায় যেন সামান্য মাইনেতে চাকরি করে, শনিবারে শনিবারে বাড়ি আসে, কোনো শনিবারে আসেই না। শ্বশুর উপেন ভটচাজ গ্রামের জমিদার মজুমদারদের ঠাকুরবাড়িতে নিত্যপূজা করেন। সেখানেই থাকেন, সেখানেই খান। বড়ো-একটা বাড়ি আসেন না তিনিও। ভালো খেতে পান বলে ঠাকুরবাড়িতেই পড়ে থাকেন, নইলে সকালের বাল্যভোগের লুচি ও হালুয়া, পায়েস, দই ও বৈকালির ফলমূল বারোভূতে লুটে খায়।
কোনো কোনো দিন সন্ধ্যার দিকে তিনি বাড়ি আসেন। হাতে একটা ছোট্ট পুঁটুলি, তাতে প্রসাদী লুচি ও মিষ্টি, ফলমূল, একটু বা ক্ষীরের ছাঁচ থাকে। তাঁর নাতি করুণার বয়স এই সাত বছর। না-খেতে পেয়ে সে সর্বদা খাইখাই করছে, যা হয় পেলেই খুশি, তা কাঁচা আমড়া হোক, পাকা নোনা হোক, চালভাজা হোক, তালের কল হোক, আধপাকা শক্ত বেল হোক। খাওয়া পেলেই হল, স্বাদের অনুভূতি তার নেই। ঝাল, টক, মিষ্টি, তেতো তার কাছে সব সমান।
—ও করুণা, এই দেখ—কী এনেছি—
—কী ঠাকুরদাদা?
‘দাদু-টাদু’ বলার নিয়ম নেই এইসব অজ পাড়াগাঁয়ে, ওসব শৌখিন শহুরে বুলি করুণা শেখেনি। সে ছুটে যায় উৎসুক লোভীর ব্যর্থতা নিয়ে। ঠাকুরদাদা পুটুলি খুলে দু-খানা আখের টিকলি, একটা বাতাসা ওর হাতে দেন। ও তাতে মহাখুশি। ঠাকুরদাদা যে জিনিস দেন, তার চেয়ে যে জিনিস দেন না অনেক ভালো ও অনেক বেশি। পুঁটুলির সে-অংশে থাকে বৈকালি ভোগের লুচি, কচুরি, মালপোয়া ও তালের বড়া। যখনকার যে ফল সেটা ঠাকুরকে নিবেদন করার প্রথা এ ঠাকুরবাড়িতে বহুকাল থেকে প্রচলিত। এখন ভাদ্র মাস, কাজেই তালের বড়া রোজ বিকেলে নিবেদিত হয়।
করুণা এক-আধবার পুঁটুলির অন্য অংশে চাইলে। কিন্তু তাতে তার লোভ হয় না, ওরকম দেখতে খুব ছেলেবেলা থেকে সে অভ্যস্ত। সে জানে ও অংশে তার কোনো অধিকার নেই।
ঠাকুরদাদার দিকে ও বোকার মতো চেয়ে থাকে। উপেন ভটচাজ গলায় কাশির আওয়াজ করে পুত্রবধূকে তাঁর আগমনবার্তা ঘোষণা করতে করতে বাড়ি ঢোকেন এবং সটাং দোতলায় নিজের ঘরটিতে চলে যান।
রোজ তাঁর ঘরটিতে নিজে চাবি দিয়ে বেরিয়ে যান এবং এসে আবার খোলেন। পুত্রবধূকে বিশ্বাস করার পাত্র নন তিনি। কোনো মেয়েমানুষকেই বিশ্বাস নেই।
—ও বউমা—বউমা, ওপরে এসো—
—কে? বাবা?
—একবার ওপরে এসো।
পুত্রবধূ ওপরে গিয়ে দেখে শ্বশুর পুটুলি খুলে কীসব খাবার জিনিস এস্তভাবে হাঁড়ির মধ্যে পুরছেন। পুত্রবধূকে দেখে তাড়াতাড়ি তিনি হাঁড়িটার দিকে পেছন ফিরে বসে বললেন—বউমা? ইয়ে করো তো—আমার ঘরে একটা আলো জ্বেলে দিয়ে যাও।
—আপনি রাতে কী খাবেন? ভাত রাঁধব?।
—না। তুমি শুধু খাবার জল একঘটি দিয়ে যেও এর পরে।
এ সংসারে বৃদ্ধ শ্বশুরের জন্য পুত্রবধূর রাঁধবার নিয়ম নেই। যার যার, তার তার। ছেলে যখন আসে, বাপের খোঁজ নেয় না। ওরা নিজে রাঁধে, নিজেরা খায়। উপেন ভটচাজ এসে নিজের ঘরের তালা খুলে বড়ো জোর একটু জল কোনোদিন বা একটু নুন চান পুত্রবধূর কাছে। এর বেশি তাঁর কিছু চাইবার থাকে না, কেউ তাঁকে দেয়ও না। আজ পুত্রবধূর তাঁর জন্যে রান্না করার প্রস্তাবে তিনি খানিকটা বিস্মিত না-হয়ে পারেননি মনে মনে। বোধ হয় সেইজন্যে পুত্রবধূর প্রতি তাঁর মনোভাব হঠাৎ বড়ো দরাজ হয়ে গেল। তার ফলে যখন আবার সে জলের ঘটি নিয়ে ঢুকল, তখন তিনি হাঁড়িটা সামনে নিয়ে বললেন—দাঁড়াও বউমা, করুণাকে দিইছি—আর তুমি এই দু-খানা লুচি আর
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments