বক্সারের যুদ্ধ
পলাশীর যুদ্ধের পর মীরজাফর নামে স্বাধীন নবাব হলেন বটে কিন্তু স্বাধীনভাবে কিছুই করবার উপায় রইল না তাঁর। ক্লাইভ ইংরেজ কোম্পানীর সামান্য একজন কর্মচারী ছিলেন, হলেন কলিকাতার কুঠীর গভর্ণর কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি নবাবের নবাব হয়ে বসে রইলেন। মীরজাফরের এ অবস্থাটা ভাল লাগল না। তিনি প্রতিবাদ করতে লাগলেন, অবশ্য মৃদুভাবে। তবে তাতে কোনও ফল হ’ল না। বিহারের সহকারী শাসনকর্তা রামনারায়ণ এবং দেওয়ান রায়দুর্লভের ধৃষ্টতা অসহ্য হওয়াতে তাদের সে পদ থেকে সরাতে যাবেন—তাতেও ক্লাইভ বাধা দিলেন। অথচ ক্লাইভকে উড়িয়ে দিতেও পারেন না। বিশেষ ক’রে সিংহাসনে বসবার বৎসর দেড়েকের মধ্যেই যখন দ্বিতীয় শাহ আলম বিহার আক্রমণ করলেন তখন ইংরেজের সাহায্য নিয়েই তাঁকে তাড়াতে হ'ল।
অর্থাৎ বোঝা গেল যে স্বাধীন নবাবের নিজের রাজ্যটুকুর স্বাধীনতা রক্ষা করবার ক্ষমতাও নেই।
এইবার মীরজাফর চেষ্টা করলেন গোপনে পর্তুগীজদের সঙ্গে মিতালি করবার। পর্তুগীজরাও তাতে রাজী হয়েছিল, কিন্তু ক্লাইভের চেষ্টায় সে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হ’ল, বেদারার যুদ্ধে পর্তুগীজরা শোচনীয়ভাবে হেরে গিয়ে সন্ধি করতে বাধ্য হ’ল।
অবশেষে ১৭৬০ খ্রীষ্টাব্দে মীরজাফরের জীবনে দুটি স্মরণীয় ঘটনা ঘটল। ক্লাইভ দেশে ফিরে গেলেন এবং মীরজাফরের একমাত্র পুত্রের মৃত্যু হ’ল।
এবার প্রশ্ন উঠল, নবাবের উত্তরাধিকারী কে হবেন?
মীরজাফরের সম্বন্ধে মনোভাব ইংরেজদের মোটেই ভাল ছিল না—তার কারণ ওঁর বিশ্বাসঘাতকতা ও অকর্মণ্যতা। তাছাড়া কোম্পানীর বহু টাকা তখনও তিনি পরিশোধ করেন নি।
স্থির হ’ল ও বংশ আর নয় বরং জামাতা মীরকাসিমকে নবাব করা যেতে পারে। মীরকাসিমের সঙ্গে গোপনে একটা সন্ধিও হ’ল। মীরকাসিমের নগদ টাকা অত ছিল না—তিনি নবাবীটা পেলে বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম জেলা ইংরেজদের ছেড়ে দিতে প্রতিশ্রুত হলেন। শ্বশুরের দেনাটা শুধু নগদ শোধ করবেন এই স্থির হ’ল।
কিন্তু সেনাপতি ভ্যান্সিটার্ট যখন মুর্শিদাবাদে গিয়ে নবাবের কাছে এই প্রস্তাব করলেন যে মীরকাসিমকে সহকারী সুবাদার করা হোক্ এবং ভাবী উত্তরাধিকারী করা হোক্—তখন মীরজাফর বেঁকে দাঁড়ালেন। অথচ উপায়ই বা কি? কোম্পানীর লোক অটল। এধারে পূর্বেকার ষড়যন্ত্রে যারা বন্ধু ছিল তাঁর, তারাই এখন তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। কোনও দিকে কোনও অবলম্বন নেই। তবু মীরজাফরের কোথায় তখনও আত্মসম্মান ছিল একটু অবশিষ্ট—তিনি কোম্পানীর প্রস্তাবে রাজী হলেন না বরং সিংহাসন ছাড়তে রাজী হলেন।
এইভাবে বিনা রক্তপাতে মীরজাফরকে সরিয়ে মীরকাসিম সুবে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব-নাজিমের গদীতে অভিষিক্ত হলেন।
কিন্তু ইংরেজদের সঙ্গে বনিবনাও হওয়া তাঁর পক্ষেও সম্ভব ছিল না।
মীরকাসিম ছিলেন সুদক্ষ শাসক—প্রজাদের মঙ্গলামঙ্গল সম্বন্ধে সম্পূর্ণ সচেতন। এধারে ইংরেজদের অত্যাচারে বাঙালী তখন জর্জরিত।
সম্রাট-প্রদত্ত ফরমানে কোম্পানী বিনাশুল্কে বাণিজ্য করবার অধিকারী কিন্তু তাই বলে তো আর কর্মচারীরা নয়! অথচ তখন কোম্পানীর সব কর্মচারীই নিজস্ব বিপুল ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। তারাও কেউ শুল্ক দেয় না, সেজন্য তাদেন লাভের অংশ মোটা হয়। প্রতিযোগিতায় এদের সঙ্গে পেরে ওঠে না বাঙালী বা হিন্দুস্থানী ব্যবসায়ীরা। এদের শুল্ক দিয়ে দাম বেশী পড়ে যায়, খদ্দেররা তা শুনবে কেন?
অবশ্য মীরজাফরও এ ব্যবস্থার একটা প্রতিবাদ করেছিলেন কিন্তু কোনও ফল হয় নি। মীরকাসিম একটু কড়া প্রতিবাদ করলেন। তার ফলে মুঙ্গেরে ভ্যান্সিটার্টের সঙ্গে নবাবের একটা আপোষ বন্দোবস্ত হ’ল। কিন্তু কলিকাতা পরিষদ সে বন্দোবস্ত নাকচ ক’রে দিলেন। তখন মীরকাসিম সমস্ত প্রজাদের ওপর থেকেই শুল্ক উঠিয়ে নিলেন।
ইংরাজেরা পড়ল মহা ফাঁপরে। খোলাখুলি প্রতিযোগিতায় এ দেশের লোকের সঙ্গে ওদের পেরে ওঠা সম্ভব নয়। তারা পীড়াপীড়ি করতে লাগল পূর্বেকার সুবিধা ফিরে পাবার জন্য। এমন কি পাটনা-কুঠীর কর্তা এলিস সাহেব জোর ক'রে নিজেদের সুবিধা আদায় করার চেষ্টা করলেন। মীরকাসিমের এতটা ধৃষ্টতা সহ্য হ’ল না। তিনি এলিসকে কঠোর হস্তে দমন করলেন। আর তার ফলেই ইংরেজদের সঙ্গে সোজাসুজি যুদ্ধ বাধল।
উভয়
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments