বাংলাদেশ অন্য দেশের জন্য প্রেরণা
বক্তা: এডওয়ার্ড কেনেডি
[মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি (২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৩২-২৫ আগস্ট ২০০৯) বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভমিকা রাখেন। সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তিনি এ বক্তৃতা দেন।]
আমি বাংলাদেশে এসেছি আপনাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের লাখো মানুষের শুভকামনা পৌছে দিতে। বাঙালির সংগ্রামী চেতনার প্রতীক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দাঁড়িয়ে আমি গর্বিত।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস বলে, আমরা সব সময় স্বাধীনতার পক্ষে। যারা স্বাধীনতা, মানুষের মর্যাদার ও অন্যান্য মানবিক মূল্যবোধ অটুট রাখতে কাজ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ তাঁদের সঙ্গে আছে। কোনো কোনো সরকার আপনাদের এখনো স্বীকৃতি না দিলেও পৃথিবীর মানুষ শোষণ আর নিপীড়ন থেকে আপনাদের মুক্তি অর্জনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আপনাদের দুঃসময়ে আমি একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। গত আগস্ট মাসে ভারতে শরণার্থী শিবিরগুলোতে গিয়ে আমি দেখেছি যুদ্ধের আগুনে পুড়ে যাওয়া পরিবার, অনাহারী শিশু, মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ। আমি বাংলাদেশেও আসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা চায়নি পৃথিবী জানুক এখানে কী হচ্ছে। আপনাদের দুর্দশা পৃথিবীর সবার মতো আমাকেও ব্যথিত করেছে। আজ পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশ এক গৌরবোজ্জ্বল, নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, আমি আজ উচ্ছ্বসিত। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন 'চিত্ত যেথা ভয় শূন্য, উচ্চ যেথা শির, জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর, সেই সুউচ্চ মর্যাদায় আজ এ দেশ অধিষ্ঠিত হয়েছে।
পৃথিবীর অনাগত প্রজন্মের জন্য বাংলাদেশের সংগ্রাম এক শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের জন্মের গৌরবগাঁথা যুগে যুগে অন্য দেশের অন্য জাতির মানুষদের প্রেরণা জোগাবে, যারা এখনো স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি।
আজ থেকে ২০০ বছর আগে, এখান থেকে ১০ হাজার মাইল দূরে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে আমাদের পূর্বপ্রজন্ম স্বাধীনতাসংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন। স্বাধীনতা অর্জনের পথ আমাদের জন্যও ছিল কণ্টকাকীর্ণ। এক শক্তিশালী, প্রতিষ্ঠিত সরকার আমাদের বেলায়ও পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছিল। সংগ্রামের প্রথম দিকের নেতৃত্বের ওপর ভয়াবহ অত্যাচার-নির্যাতন চালানো হয়েছিল। যখন নতুন জাতির জন্ম হলো, অনেকে বলেছিল এমন দুর্বল, দরিদ্র দেশ এ পৃথিবীতে টিকতেই পারবে না। তারা ভেবেছিল আমাদের স্বাধীনতা ব্যর্থ হবে। কিন্তু আমরা তাদের সে ধারণা ভুল প্রমাণ করেছি। আমরা দরিদ্র ছিলাম, কিন্তু বুকে আশা আর সাহসের কোনো কমতি ছিল না। জনগণ উদ্যমী হয়ে দেশ গড়ার কাজে এগিয়ে এসেছিল আর আমাদের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সহযোগিতা করেছিলেন। তাই বলে আমেরিকান বিপ্লব ১৭৭৬ সালে শেষ হয়ে যায়নি। ওয়াশিংটন আর জেফারসনের মৃত্যুতেও বিপ্লবের মৃত্যু ঘটেনি। সেই সংগ্রাম আজও চলছে; বর্ণ-গোত্রনির্বিশেষে আমাদের সব নাগরিকের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে নিপীড়িত মানুষের জন্য আমাদের সহমর্মিতার মধ্যে সেই সংগ্রামের চেতনা মিশে আছে। এ কারণেই বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রাম যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের বিবেককে গভীরভাবে স্পর্শ করে অতীতের স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছে। আমরা অনুভব করেছি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ধর্ম-বর্ণ-গোত্র এমনকি জাতিগত বিভেদেরও অনেক ঊর্ধ্বে।
বিগত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র সরকার আপনাদের পাশে না থাকলেও আমাদের জনগণ আপনাদের সঙ্গে ছিল। আমরা আপনাদের সঙ্গে একাত্ম হয়েছি এবং আমাদের নেতৃত্বও বেশি দিন পিছিয়ে থাকবে না। এক অর্থে আমরা সবাই বাঙালি, সবাই আমেরিকান এবং আমরা এক ও অভিন্ন মানব জাতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
যারা বর্তমান পৃথিবীতে স্বাধীনতা আর আত্মপ্রত্যয়ের শক্তি নিয়ে সন্দিহান, বাংলাদেশ তাদের সামনে এক জ্বলন্ত প্রমাণ তুলে ধরেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে আপনারা উপেক্ষিত নন। আমি আপনাদের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে শিখতে এসেছি। শরণার্থী শিবিরের সেই সব দুঃখ-ভারাক্রান্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলতে এসেছি। স্বাধীনতার জন্য আপনারা যে মহান আত্মত্যাগ করেছেন, তাঁর সম্মানে আমার দেশের জনগণ সবকিছু নিয়ে আপনাদের পাশে দাঁড়াবে। ১০০ বছর আগে আমাদের গৃহযুদ্ধের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments