ও আর তারা
[ ওর পরিচয়: ওর বয়স পঁচিশ। চেহারা ধারালো, ক্ষুদ্র উজ্জ্বল চোখদুটো অস্মিতাময়। জীবনে ওর অখণ্ড অবসর, এবং ব্যাংকে অজস্র অর্থ। তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য এই: কেউ গাছ থেকে ফুল ছিঁড়ে অর্থহীন পুলকে প্রেমিকার খোঁপায় গুঁজে দিলে ও ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে।]
সহজ গতি:
ওর ভাষায় আজ সন্ধ্যার কথা:
সায়ন্তন শান্ত অথচ উজ্জ্বল আকাশে রঙের অসংখ্যতা ও সীমাহীনতা। এবং সে-বর্ণঝর্না যেন আজ অত্যুজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে গুঞ্জনময় কোলাহলমুখর আলোকিত শহরের বুকে। চারধারে ঝলমলানি, অস্ফুট সৌন্দর্যের মৃদু অথচ কঠিন অভিব্যক্তি, প্রাণ-স্নাত নরনারীর সংস্কৃতি-তরঙ্গের অনাবিল ঝিকিমিকি, এবং সে-ঝিকিমিকির একান্ত অন্তরালে ও নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছে—হঠাৎ ফুটন্ত অস্বাভাবিক উত্তুঙ্গ পুষ্পটির পাপড়িগুলো হতে দূরে, ধূসর-স্নিগ্ধ—নির্জনতার একান্তে। (সেটা দোতলার দক্ষিণ দিকের ছোট ঘরটি।)
এ-সন্ধ্যাটি ওর লেগেছে ভালো। তাই ঠিক করলে যে সন্ধ্যার ঘনায়মান ধূসরতার পানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে নীরবে সে আজ ভাববে, হাতে জ্বলবে সিগ্রেট, এবং ঘরে থাকবে অনুভূতিময় নিস্তব্ধতা—কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই হল না।
আপনার বয়স কত? ... : পঁয়তাল্লিশ। ... অবশেষে অর্ধস্ফুট কণ্ঠে বললে: কী সুন্দর আপনি! ... (হঠাৎ) আমাকে বিয়ে করবেন? ... তবু ওদের বিয়ে হল। হল এক শান্ত সন্ধ্যায়...।
হল না তার কারণ এই যে, ঠিক এমন সময়ে হঠাৎ নাক-উঁচু মেয়েটির আগমন ঘটল। আপনার কবি হওয়া উচিত ছিল, সত্যি।
অযাচিত মন্তব্যে ও সচকিত হয়ে উঠল।
বসুন।
কিছুক্ষণ পর: কী ভাবছেন?
—কৈ, কিছু না-তো? (ও ভাবছে—[ভাষা তার]: আদি যুগ হতে কবিদল-নানা ভাষায় নানাভাবে, আবিষ্কারে ও গবেষণায় নারীর চরণে তাদের স্তুতি-অর্থমালা নিবেদন করে আসছে, এবং সাথে-সাথে গদগদ কণ্ঠে চিরকালই বলে আসছে যে তারা চির দুয়ে, এবং সাথে সাথে তাদের চটুল কটাক্ষে চিরকাল ধরে শুধু বিভ্রান্তই হচ্ছে। তাই তারা ওর কাছে সর্বদিক হতে—আকাঙ্ক্ষা, বিকাশে ও ব্যর্থতায় হীন ও দীন। আহা তাদের প্রৈতি ও প্রতিভা যদি অমনি বিপথে নিষ্ফলভাবে ব্যয়িত না হত, তবে এতদিনে মানবজাতি অনুভূতিতে অভিব্যক্তিতে ও বিচিত্র প্রকাশে ঋদ্ধির উচ্চতম শিখরে পৌঁছতে পারত।।
বা, কিছু না-তো মানে?
তা ভাবছি বৈকি। ভাবছি—
থামলেন যে?
অসমাপ্ত কথাটা নাক-উঁচু মেয়েটির অন্তরে যে তুমুল তরঙ্গের সৃষ্টি করেছে ও বুঝতে পারল। এবং সে-তরঙ্গ মুহূর্তে নিস্তরঙ্গ করবার কৌশলও তার জানা আছে। তাই বলল: বাঃ, আপনাকে আজ ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে। ঐ রুপালি পাড়, আর গাঢ় কমলা রঙের শাড়ি, তাছাড়া আপনি তো শরদিন্দুনিভাননী ...
—আহা, ভারি তো! মেয়েটির আনন্দের তীব্রতা তাচ্ছিল্যের রূপে প্রকাশিত হল। মনের ভাব ঠিক উল্টো আলোয় প্রকাশ করতে সে অত্যন্ত ভালোবাসে, এবং এটা আসল ভাব দূরীভূত করবার একটা অভিনব প্রচেষ্টা। (ওর ভাষায়: এ-প্রচেষ্টা আধুনিক শিল্প উৎপাদনের মতো ঘোরালো ব্যাপার।
আপনি সব দিক থেকে ভয়ানক আকর্ষণময়, শুধু মেয়েটি হেসে ফেলল।
বলুন।
শুধু একটু নীরস।
(তবু নীরস? আশ্চর্য। কৌশল সম্পূর্ণ সফল হয় নি তাহলে।।
তা একটু বৈকিও হাসল, কারণ আপনাদের পানে চোখ মেলে তাকাতে পারি কোথায়? কিন্তু মজা এই, তবু মেয়েরা দিনরাত আমার চারপাশে ব্যূহ রচনা করে থাকবেন (কারণ আমার হাতে অর্থের অজস্রতা, যা মেয়েদের কাছে ভয়ানক আকর্ষণময়), বাকিটা সে মনে-মনে ভেবে নিলে।
তারপর ওর একটা অদ্ভুত খেয়াল হল, অতি সস্তা খেয়াল। তাই হঠাৎ বললে: জানেন, এমন সময় আমি এ-ঘরে কাউকে আসতে দিই না।
—অর্থাৎ, (মেয়েটি ক্রমশ ফুলে উঠছে। অর্থাৎ আমাকে জানাচ্ছেন যে আপনার এখানে আমার অনধিকার প্রবেশ হয়েছে? —এক মুহূর্তে মেয়েটির কণ্ঠ অভিমানে জমাট হয়ে গেল, আর কখনো, কখনো আমি আপনার কাছে আসব না। জানি, আমার সান্নিধ্য আপনার মোটেই ভালো লাগে না, তবু যাক।
মেয়েটির ভ্রমরকৃষ্ণ-করা চোখ ছলছল করে উঠল, আর রক্তিম ঠোঁটের পাশে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments