প্রবল হাওয়া ও ঝাউগাছ

সন্ধের দিকে কোত্থেকে একটা জমাট মেঘ উড়ে এল, যার অভিক্ষেপগুলো কৌণিক ও তীক্ষ্ণ। মেঘ এল আর সাথে সাথে দুর্দান্ত হাওয়া শুরু হল, বাগানের ঝাউগাছগুলোতে প্রচণ্ড সাড়া পড়ে গেল। নওয়াজের স্ত্রী সকিনা ধূসর রঙের শাড়ি পরে ওঘর থেকে বেরিয়ে এল, বারান্দায় নওয়াজকে বললে: দেখেছ, কেমন হাওয়া?

—ভালো লাগছে তোমার?

—বাগানে যাবে? গিয়ে বসবে ওই ঝাউগাছগুলোর তলায়?

ঝাউগাছগুলোতে এমন একটা বিচিত্র শোঁ-শোঁ আওয়াজ, ওরা দুজন তার তলায় না গিয়ে পারলে না। গিয়ে তারা একটা দীর্ঘতর ঝাউগাছের তলায় বসলে। সকিনা তার মাথার রুক্ষ চুল ছেড়ে দিলে, প্রবল হাওয়ায় বোশেখি মেঘের মতো সে-চুল উড়তে থাকল। নওয়াজ কোনো কথা না-কয়ে শুধু তার একটি হাত নিজের হাতের মুঠোয় বন্দি করলে, চোখে তার হাওয়ার আঘাতে সৃষ্ট হাওয়ার মতো চাঞ্চল্য।


ওদের ঝাঁঝানো নেশা হল, হাওয়ার চেয়েও দুর্বার স্বপ্ন এল ওদের দেহ জড়িয়ে, অসংখ্য তারার মতো তাদের হৃদয় লক্ষ শিরায় দপদপ করতে থাকল। আবার সকিনা চেঁচিয়ে উঠল, তীব্র তীক্ষ্ণ সে-কণ্ঠ: আমরা জয়ী! ... দেখছ না, আমার চুল উড়ছে কী করে? মৃত্যুকে এই মুহূর্তে আমি তুচ্ছ মনে করি।


সন্ধে ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে। হাওয়া যেন আরো প্রবল হয়ে উঠছে, অথচ বৃষ্টি নেই। হাওয়ার আঘাতে সকিনা চোখ মেলতে পারছে না, তবু সে একবার জোর করে চোখ খুলে তাকালে নওয়াজের পানে, তারপর চেঁচিয়ে ডাকলে: এই

—কী?

—কিছু না।

একটু পরে সকিনা আবার চেঁচিয়ে উঠল: এমন হাওয়া দেখেছ, আর শুনেছ এমন শোঁ-শোঁ আওয়াজ? আমি যেন ভেসে গেলাম উড়ে গেলাম।... আমার হাত ধরেছ শক্ত করে?

—ধরেছি।

ক্রমে আঁধার জমল ঘন হয়ে, আর ওরা আবছা হয়ে উঠল। আকাশে অগণিত তারার মালা ঝকঝক করতে থাকল, এবং এই হাওয়ায় যেন কাঁপতে থাকল। এত হাওয়া আর এত তারা যে, ওরা ভুলে গেল পৃথিবীকে, ভুলে গেল সবকিছু—অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ। ওদের ঝাঁঝানো নেশা হল, হাওয়ার চেয়েও দুর্বার স্বপ্ন এল ওদের দেহ জড়িয়ে, অসংখ্য তারার মতো তাদের হৃদয় লক্ষ শিরায় দপদপ করতে থাকল।

আবার সকিনা চেঁচিয়ে উঠল, তীব্র তীক্ষ্ণ সে-কণ্ঠ: আমরা জয়ী!

—কিসে?

—তা জানি না, কিন্তু আমরা জয়ী। দেখছ না, আমার চুল উড়ছে কী করে? মৃত্যুকে এই মুহূর্তে আমি তুচ্ছ মনে করি। বলে সকিনা কেমন খনখনে গলায় অদ্ভুতভাবে হাসতে থাকল। হাসির মধ্যেই একবার বললে: আমি তারার পানে চেয়ে আছি, তোমাকে আর ভালোবাসি নে।

হাওয়া যখন থেমে গেল, আর সকিনার পিঠে ও কাঁধে রুক্ষ চুলের রাশি এলিয়ে পড়ল, তখন ওরা দুজন ঘুম থেকে জেগে-ওঠার চোখ নিয়ে পরস্পরের পানে তাকাল, মুখে কিছু বললে না। তারপর তারা উঠে আস্তে ঘরে ফিরে এল, তবু মুখে কোনো কথা নেই। প্ৰবল হাওয়ার ঝড়ে তারা তাদের অন্তরের কথা নিঃশেষ করে দিয়েছে।

বৈশাখ ১৩৫০

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

আজকের কুইজ

[কুইজে অংশ নিয়ে জিতে নিন এক মাসের ফ্রি সাবক্রিপশন]

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice