স্থাবর

ভোর হতে সন্ধে পর্যন্ত এ স্থান ভরে শুধু খটাখট শব্দ। এতগুলো লোক, সবাই নীরব, কারো মুখে কোনো কথা নেই। এরা নৌকো তৈরি করে, বিভিন্ন প্রয়োজনের বিভিন্ন ঢঙের নানারকম নৌকো। সাম্পান হতে শুরু করে তিনশ' চারশ' মনের সাগরে মাছ ধরবার বা মাল বইবার বড়-বড় নৌকো এরা অনায়াসে তৈরি করতে পারে এবং করে।

কর্ণফুলী নদীর এ-ধারটা ঝোপঝাড়ে ঢাকা পাহাড়, তার ঠিক নিচেই নদীর তীর দিয়ে যে-খানিকটা সমতলভূমি, সেখানে তাদের নৌকো বানাবার কারখানা। একপাশে বিরাট টিনের গুদাম, সেখানে তারা কাঠ রাখে। তার পাশেই ছোট চালার ঘর, রাতে সেখানে লোক থাকে আর পাহারা দেয়। পাহাড়টা পেরিয়ে কাছেই গাঁ। এ-গাঁয়ের লোকদের পেশাই নৌকো বানানো, পুরুষানুক্রমে এরা এ-গাঁয়েতে বাস করছে আর নৌকো তৈরি করছে। এদের দেহ শক্ত, স্বভাব শান্ত এবং স্বল্পভাষী। কিন্তু যখন ওরা রেগে ওঠে তখন তাদের মুখ দিয়ে অনর্গল খৈ ফুটতে থাকে আর চোখ জ্বলতে থাকে আগুনের মতো। লোহার মতো শক্ত দেহ হলেও তাদের মন মাটির মতোন নরম। ব্যবসা করেও তারা লোক ঠকাতে জানে না, তারা টাকা বাজিয়ে নেয় বটে লুকিয়ে নেয় না।

আকাশে রোদ চড়া হয়ে উঠেছে। তাই ওপারের ঘন গাছগুলোর রং ফিকে হয়ে উঠেছে। সেদিকে মাসুদ একবার চোখ তুলে চাইল, তারপর মুখ ফিরিয়ে তাকাল তার সহকর্মীদের পানে। আজ কাজ কম, মোটে বিশ জন লোক খাটছে, তৈরি হচ্ছে বারটা সাম্পান। মাসুদের কাজ রং লাগানো; রঙের কাজে সে ওস্তাদ। সে সূক্ষ্মভাবে নকশা কাটে, তারপর সেগুলো নানা রঙে রঙিন ও মনোহর করে তোলে।


সাগরের ডাক শুনছ, কিন্তু তাতে কান দিও না। শহর থেকে লোক তবু ফেরে, সাগর থেকে কেউ ফিরতে পারে না।


তার বয়স তেমন বেশি কিছু নয়, হয়তো আঠার কি উনিশ। তার বাপ ছিল নামকরা রঙের মিস্ত্রি, কিন্তু সে মারা গেছে আজ বছর পাঁচেক হবে। সেই হতে মাসুদ এ কাজে লেগেছে।

রং নিয়ে তার কারবার, হয়তো তাই তার মনেও রঙের খেলা চলে। কাজ করতে-করতে সে চোখ তুলে ওপারের আবছা রৌদ্রদীপ্ত বনরেখার পানে চেয়ে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। তার হাত নিশ্চল হয়ে থাকে, চোখদুটো ভরে আসে স্বপ্নে, এবং এমনিই সে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না বুড়ো সর্দার কেশে ওঠে। বুড়ো সর্দার একবার কেশেছে কি অমনি তার হাত চঞ্চল হয়ে ওঠে, চোখ ও মন ফিরে আসে কাজে।

আজ সে সাম্পানের পিছনে রশ্মিরেখাসুদ্ধ সূর্য এঁকেছে। সূর্যে গাঢ় লাল রং দিয়েছে, রশ্মিরেখায় হালকা লাল, হয়তো কিছুটা গোলাপি, আর বাকি স্থানে গাঢ় নীল রঙের প্রলেপ দেবে। সমস্ত নৌকোতে সেই রং গাঢ় নীল রং, শুধু ওপরে ধার দিয়ে মোটা সাদা দাগ দেবে। এ-নৌকোয় রঙের তেমন কারুকার্য নেই।

সূর্যে সে তৃতীয় বার রং লাগাল: এইবার শেষ। নীল রঙের কাজ করবে খেয়ে এসে। তার ক্ষিধে পেয়েছে। নানারকম রঙে-ভরা চটে সে হাতের আঙ্গুলগুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মুছল, তারপর বাঁ হাতের পিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছে নদীর পানে চাইল। বহুদূরে দুর্গম পর্বতে হয়তো জোর বৃষ্টি হচ্ছে, তাই নদীর পানি ফুলে উঠেছে, স্রোত খরতর হয়ে উঠেছে। নদীর পানি কেমন শব্দ করে দ্রুতবেগে বয়ে যাচ্ছে তাই চেয়ে দেখতে মাসুদের ভারি ভালো লাগে। এই যে পানি বয়ে যাচ্ছে কলকল করে, কোথাও-বা ঘুরে-ঘুরে চক্রাকারে, কোথাও-বা আঘাত খেয়ে, এ পানিরাশি গিয়ে পড়বে সাগরে, সে-সাগর সে কখনো দেখে নি।

সাগর সে কখনো দেখে নি; শুধু শুনেছে সাগরের কথা ও কাহিনী, কখনো দেখে নি। কিন্তু সাগরের হাওয়া কি লাগে নি তার গায়ে? কে জানে। নদী থেকে মুখ ফিরাতেই হঠাৎ তার বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

৯৯

এক মাস

৯৯

৩০

মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

আজকের কুইজ

[কুইজে অংশ নিয়ে জিতে নিন এক মাসের ফ্রি সাবক্রিপশন]

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice