হোমেরা
দক্ষিণের জানালাটা খোলা, পর্দাও সরানো। গুমট গরমের পর বাইরে হাওয়া দিয়েছে, তার কিছু জানলা গলে ভেতরেও আসছে।
সন্ধেয় বেড়িয়ে ফেরার পর আকরমের এক পেয়ালা চা খাবার অভ্যেস। আজ বেড়িয়ে ফিরে জামা-কাপড় ছেড়ে একটা পাতলা সিল্কের লুঙ্গি পরে খালি গায়ে ইজিচেয়ারটাতে হেলান দিয়ে বসেছে, এমন সময় হোমেরা চায়ের পেয়ালা নিয়ে আস্তে ঘরে এল। ইজিচেয়ারের পাশে টিপয়, তার ওপর সে পেয়ালাটা নাবিয়ে রাখলে। চা দেবার পর আর কোনো কাজ নেই, কোনো কথাও নেই, তাই হোমেরা দরজার পানে আবার চলতে শুরু করেছে তখন আকরম পেছন থেকে আস্তে ডাকলে: শোন।
—কী? হোমেরা দাঁড়াল।
টিপয় থেকে পেয়ালা তুলে তাতে আকরম এক চুমুক দিলে, তারপর স্বাভাবিক গম্ভীর কণ্ঠে
বললে: আজ ও আসবে বুঝি?
—ও, ও কে? রহিমের কথা বলছেন?
—তো তুমি ভালো করে জান। এখুনি আসবে, না? তোমাকে খবর দিয়েছে?
প্রেমের মূর্তি দেখলে রহিম? তোমরা-তো এর সম্বন্ধে লম্বা-চওড়া কথা বল, উঁচু-উঁচু ভাব ছড়াও, গান গাও, কবিতা লেখ, কিন্তু দেখলে এর পাশবিক মূর্তি? ... নিরস্ত্র মানুষ পাশবিক শক্তির কাছে হার মানতে বাধ্য। এখনো পশুশক্তির রাজত্ব পৃথিবীতে অটুট, কারণ মানুষ এখনো পশু...
হোমেরা চোখ বন্ধ করে হঠাৎ হেসে উঠলে। অবাক হয়ে বললে: -আমাকে খবর দিতে যাবে কেন? সে যে গাঁ থেকে শহরে ফিরে এসেছে সে-কথাই-তো আমি জানিনে। কবে এসেছে? আপনার সাথে দেখা হয়েছিল ভাই?
আকরম কোনো জবাব দিলে না, নীরবে পেয়ালায় চুমুক দিতে থাকল। তারপর হোমেরা যখন যাবার জন্য আবার একটু নড়বার ভঙ্গি করলে, তখন আকরম চোখ তুলে সোজাসুজি চাইলে তার পানে। সংযত ও পরিষ্কার গলায় বললে: ওর চাকরটার সাথে পথে আমার দেখা হয়েছিল, চিঠিটা আমি পড়েছি। তোমার সাজগোজের বাহার যে চোখে পড়বে না, অতটা কানাও আমি নই।
—সাজগোজ? বা রে, সাজগোজ করেছি কোথায়?
—যাক, আমার দুটো চোখ রয়েছে। আশ্চর্য হই তোমার মিছে কথা বলার শক্তি দেখে, অনর্গল বেরোয়, কোথাও একটু বাধেও না। আচ্ছা, ও গাঁয়ে ছিল-তো দিন পনের, এর মধ্যে তার কাছে ক’খানা চিঠি লিখেছ?
—একটাও না। টিকিটের পয়সা কোথেকে পাব যে লিখব? লিখলে আপনারা বুঝি জানতেন না।
--আম্মার হাতবাক্সের খবর তো আমি জানিনে। তাছাড়া দুয়েক পয়সার গোলমাল হলে আম্মা কখনো কাউকে কিছু বলেন না। ক’খানা লিখেছ?
—একটাও না। —একটার উল্লেখ তো রহিমের ওই চিঠিটাতেই রয়েছে, কাজেই অমন ডাহা মিছে কথা আমাকে শুনিয়ে লাভ নেই। যাক, ও-সব কথাতে আমার প্রয়োজন নেই, আসল কথা শোন। বস ওই চেয়ারে—
—বসব না, আমার কাজ আছে। নিন, কী বলবেন ঝটপট বলে ফেলুন।
কয়েক মুহূর্ত আকরম নির্বাক থাকল, তারপর আস্তে প্রশ্ন করলে: রহিমের খবর তুমি জান?
—না।
—তার চরিত্রের খবর তুমি রাখ?
—না।
—আবার মিছে কথা?
—মিছে কথা নয়, সত্যি বলছি জানি না, কারণ সে খবর রাখার দরকার আমার নেই।
—বেশ, দরকার যদি না থাকে, তবে এরপর যদি তার সাথে তোমার কোনো সম্বন্ধ দেখি তাহলে দেখে নিয়ো। কেমন?
হোমেরা চুপ করে রইল। তাই আকরম আবার বললে: রাজি? ও কী চুপ করে রয়েছ কেন, কথা বল।
এবার শান্ত গলায় নির্বিকারভাবে হোমেরা উত্তর দিলে: আমার কাজ আছে, কী বলবেন বলুন।
ওর কণ্ঠের শান্ততায় আকরম বিস্মিত হয়ে তাকালে তার মুখের পানে: ওর মুখ নিষ্কম্প, তাতে ঘাম জমেছে, তার চোখদুটি আকরমের মুখের ওপর স্থিরভাবে নিবদ্ধ। কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থেকে হঠাৎ নাক সিটকে সে বললে: গেঁয়োদের মতো কত স্নো মেখেছ? ঘামাচ্ছ এমন করে যেন মুখে পানি দিয়েছ।
হোমেরা যেমনি ছিল তেমনিই রইল, শুধু দৃঢ়কণ্ঠে বললে: তা রহিম
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments