মানুষের জীবন (ভূমিকা)
লেখক: ইগর স্তকমান
মানুষের জীবন... তার সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দেয় আজেরবাইজানের সমসাময়িক ছোট গল্পের এই সংকলনটি। সংকলনটি থেকে আমরা জানতে পারি মানুষের জীবন আসলে কি, কেমন করে তা অতিবাহিত হয়, কেমন করে গড়ে ওঠে, আর যেন হঠাৎ তার বহুদিনের পথ পরিবর্তন করে নতুন পথে চলতে থাকে।
কিন্তু প্রকৃত পক্ষে এমন ঘটনা ঘটে মোটেই ‘হঠাৎ’ নয়... মানুষের ভাগ্য যেন নদীরই মতন। প্রায়ই সে আঁকাবাঁকা খামখেয়ালী, কিন্তু তার গতি আর নদীগর্ভ নির্দ্ধারিত হয় প্রধান এক নিয়ম অনুসারে যা আমাদের সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
দয়া, ভালবাসা যে মানুষে মানুষে এক অদৃশ্য কিন্তু দৃঢ়, অবিচ্ছেদ্য ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করে; মানুষের বিবেক যে তাকে হারিয়ে যেতে দেয় না; তার স্মৃতিশক্তি যে তাকে একগুঁয়েভাবে বারবার মনে করিয়ে দেয় তার দুর্বল মুহূর্তগুলির কথা, তার স্বার্থপরতা আর নিষ্ঠুরতার কথা, যখন আমরা নীতিগতভাবে অন্যের প্রতি, তার মানে—নিজের প্রতিই অনুপযুক্ত ব্যবহার করি।
পৃথিবী, আমাদের চারপাশের জীবনের (আর আমাদের অন্তরের) দিকে দৃষ্টিপাত করলেই আমাদের সামনে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে সেই মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনের ছবি, যে মানুষ কোনো না কোনো গল্পের নায়ক। মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনের এই পরিমাপ বড় কঠিন, আপোসহীন, এ হল তার নৈতিকতার পরিমাপ।
কতকগুলি দিনের সমষ্টি মানুষের এই জীবনের থেকে পৃথক করে নেওয়া হয়েছে প্রধানত কোনো একটা অংশ—কোনো এক দিন, বা একটুখানি সময়, এক মুহূর্ত।
আর এই দিনটি, সময় বা মুহূর্তটি অত্যন্ত প্রয়োজন মানুষের আত্মিক ও নৈতিক উন্নতির জন্য, যখন মানুষের মধ্যে দেখা দেবে তার নৈতিক উন্নতির জন্য প্রচেষ্টা তখনই সে নিজেকে পক্ষপাতহীনভাবে বিচার করতে পারবে।
তখন মানুষের ভাগ্যে ইতিমধ্যে যা ঘটেছে তা তার স্মৃতিতে, অনুভবে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে, আর আমরা পড়ি... তার প্রাণের স্বীকৃতি—উদ্বিগ্ন, আবেগপ্রবণ আর সম্পূর্ণ সত্য এই স্বীকৃতি।
যেমন চিঙ্গিজ হুসেনভের ‘দ্বীপ’... স্মৃতির দ্বীপগুলি, জীবনের অবিস্মরণীয় কতকগুলি টুকরো টুকরো ছবি। সময় তাকে মুছে দিতে পারে না, কারণ এই দ্বীপগুলির প্রত্যেকটি চিরন্তন হয়ে জেগে থাকবে সমুদ্রের বুকে... আমাদের সামনে যেন ‘উন্মুক্ত’ অন্তর যেখানে প্রতিটি বছরের ছবি সুস্পষ্ট প্রতিফলিত।
শিশুদের দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত প্রখর... বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা অবশ্য সেই শক্তি হারিয়ে ফেলি, কিন্তু বাল্যবয়সের কোন স্মৃতি যদি আমাদের মনে থেকে যায় তবে তা হয় অত্যন্ত উজ্জল, তীক্ষ্ণ, ঠিক তেমনই স্পষ্ট যেমন তখন দেখেছিলাম।
‘কালো রেকর্ডটা ঘুরছে। আমার মনে হচ্ছে যেন সঙ্গীত শিল্পীরা আছে ঐ বাক্সটার মধ্যে, যার থেকে গান বেরিয়ে আসছে... আমি বসে আছি মাটির বাড়ীতে শ্রমিক-কৃষকের মিলিশিয়ার তিন নম্বর অফিসে...এখানে কোন মহিলা নেই। গ্রামোফোনের ওপর রেকর্ডটা ঘুরছে—লেজগিনকা নাচ। লম্বা, বিরাট চেহারার পুরুষমানুষেরা টেবিলের উল্টোদিকে ছোট্ট জায়গাটায় নাচছে। টানটান চামড়ার বেল্ট খসখস আওয়াজ তুলছে, পরিষ্কার করা হাইবুটগুলো চকচক করছে। বাবা নাচতে ভালবাসেন, অন্য মিলিশিয়ানরাও কম যায় না, পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায় দক্ষ নাচিয়েদের মত। সবাই নাচছে, কেবল আমি দেখছি।’
মনে হয় যেন ছেলেবেলার একটা স্মৃতিমাত্র পর্যন্ত, পরিণত মানুষের চিন্তা ও অনুভূতি তার স্মৃতিশক্তি দ্বারা আহরিত এই ছবিকে সম্পূর্ণ করে, এর থেকে সিদ্ধান্ত নির্ণয় করে...
‘বহু বছর কেটে গেছে তারপর, এখন আর বিশ্বাস হয় না যে এসব সত্যিই ঘটেছিল: মিলিশিয়ানরা, লেজগিনকা নাচ। এই লোকগুলি প্রায় সবাই আমার বাবার মতই গ্রামের লোক, স্বেচ্ছায় এসে যোগ দিয়েছে এই ‘কৃষক-শ্রমিকের মিলিশিয়ায়’। যে কাজ করে তাতে বিশ্বাস করে, আর যাতে বিশ্বাস করে, তা করে।’
এখন এটা আর শুধুমাত্রই ‘ছবি’ নয়, তাই না?
আমার মনে হয়, আদর্শ ছোট গল্পয় লেখকের পংক্তিগুলি নির্ভুল, সংক্ষিপ্ত, ভাবগর্ভ, যেখানে কোন ফাঁক নেই, থাকতে পারে না, যেখানে সমস্ত
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments