সাগরের প্রজাপতি

দাদুর জন্যে পথ চেয়ে আছে উলদুজ। দাদু কাজ করেন সামুদ্রিক পেট্রলখনিতে। আজ তাঁর ঘরে ফেরার কথা। কিন্তু তুফান উঠেছে। লোকে বলে এরকম দিনে সাগরের ঢেউ ওঠে তিন তলা বাড়ির সমান উঁচু, বাতাসের ঠান্ডা ঝাপট তলোয়ারের মতো শনশনে, মেঘে ছেয়ে আসমান এমন জমাট যে চোখে কিছু দেখা যায় না।

উলদুজ দাদুর কাছে শুনেছে যে লোকে সাগরের বুকে মস্তো এক শহর তুলেছে। রাস্তাগুলো তার ভারী লম্বা লম্বা। দুধারে তার বড়ো বড়ো উঁচু বাড়ি। তারই একটা বাড়িতে থাকেন দাদু। এক হপ্তা থাকেন সেখানে, তেল তোলার ডেরিকে যতক্ষণ কাজ চলে, তারপর ফিরে আসেন বাড়িতে। ক’দিন জিরিয়ে আবার চলে যান তাঁর সাগরের শহরে। সত্যি বলতে কি, সাগরের বুকে আসল একটা শহর উঠেছে এটা উদদুজ ঠিক বিশ্বাস করেনি। দাদু হয়তো স্রেফ গল্পের মতো বানিয়ে বলেছে, ভাবত সে। জিজ্ঞেস করত, ‘দাদু, তোমাদের ও শহরে সিনেমা আছে?’

‘আছে রে,’ বলতেন দাদু।

‘দোকানে?’

‘দোকানও আছে।’

‘লাইব্রেরি?’

‘তাও আছে।’

‘মোটর-গাড়ি?’

‘আছে বৈকি। মোটর, লরি অনেক আছে।’

‘চিড়িয়াখানাও আছে?’

দাদু হেসে মাথা দোলান, ‘যা নেই, তা নেই। চিড়িয়াখানা এখনো হয়নি। তবে পাখি আছে, অনেক পাখি। আর কী তুই জানতে চাস বল।’

উলদুজ ভাবতে লাগল আর কী জিজ্ঞেস করা যায়। বলল, ‘আর ফুল আছে তোমাদের শহরে?’

‘আছে বৈকি। ফুল না থাকলে আবার শহর! যদি চাস, তোর জন্যে একটা তোড়া এনে দেবো।’

‘খুব ভালো হবে দাদু, এনে দিয়ো কিন্তু।’

এখন অধীর হয়ে দাদুর পথ চেয়ে আছে উলদুজ। ঝড় ওদিকে যেন ইচ্ছে করেই বাড়ছে। দিদিমা আঙিনার এদিক-ওদিক দেখে ঘরে ফিরে মাথা ঝাঁকালেন, ‘উঁহু,’ দাদু তোর আজ আর আসবে না।’

ঠান্ডা কেটে গেল। মৃদুমন্দ গরম পড়ল। মিঠে রোদে ভরে গেল চারদিক।

হঠাৎ দাদু এলেন, নাতনির জন্যে নিয়ে এসেছেন লাল লাল গোলাপ।

‘এবার দেখলি তো, আমাদের শহরে ফুলও ফোটে?’

ফুলদানিতে গোলাপগুলো রাখলো উলদুজ। আর দিন কয়েক পরে কাজে চলে গেলেন দাদু। সমুদ্র এবার এমনই শান্ত আর স্বচ্ছ যে জলের তলে মাছের ঝাঁকও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

কাঠের পাটাতনের রাস্তা দিয়ে দাদু যাচ্ছিলেন তাঁর তেল তোলার ডেরিকে। দুপাশে বড়ো বড়ো কাঠের টব, তাতে রঙ-বেরুঙের ফুল। তার ওপর পাক দিচ্ছে ঝলমলে প্রজাপতি। সন্ধ্যায় ফেরার সময় দাদু একটি প্রজাপতি ধরে কাচের বয়ামে পুরলেন।

‘কী ওস্তাদ, প্রজাপতির দরকার পড়ল কিসে?’ জিজ্ঞেস করলে সঙ্গীরা।

‘নাতনিকে দেবো। দেখুক আমাদের সাগরের শহরে কত সুন্দরীর মেলা।’

বৃষ্টি আর নক্ষত্র[ছোটদের গল্প সংকলন], অনুবাদ: ননী ভৌমিক, আঁকিয়ে: ওল্যা পুশকারিওভা, প্রগতি প্রকাশন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ১৯৭৮

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice