কুসংস্কার : বিজ্ঞান চেতনার পরিপন্থী
মানুষ যখন এ পৃথিবীতে প্রথম আসে, তখন জীবন ও জগতের সবকিছুই ছিলো তার কাছে অজানা-অচেনা। প্রকৃতির কাছে মানুষ ছিলো অত্যন্ত অসহায় এক প্রাণী। সবকিছুতেই ছিলো তার ভয় আতঙ্ক ও রহস্যময়তা। ভয় থেকেই তার মনে বাসা বাধে সংস্কার। আর হাজার হাজার বছরের সংস্কারের পথ ধরে কুসংস্কারের রাজপথ, তৈরি হয় এবং তা মানুষের মনে স্থান লাভ করেছে। এ সম্পর্কে লুইস হুয়েনোর বলেছেন, ইবষরবভ রং ধং ড়ষফ ধং সধহ যরষংবষভ. কিন্তু প্রয়োজনই আবিষ্কারের প্রসূতি। কার্যকারণের দীপাশিখা নিয়ে এক সময় মানুষের কুসংস্কারের পাদপীঠে কুঠারাঘাত করা শুরু হয়। শুরু হয় সভ্যতা নির্মাণের ইতিহাস। তার পশ্চাতে বিজ্ঞানের অবদানের কথা আজ আর কাউকে বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। বিজ্ঞানের কল্যাণে মানুষ অত্যাধুনিক যুগের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন যাপন করে আজও কুসংস্কারের ভূত থেকে পুরোপুরি মুক্তি পায়নি। সে জন্য আজও তাকে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যহত রাখতে হচ্ছে। কেননা কুসংস্কার অন্ধকার অভিমুখী, আর বিজ্ঞান আলো অভিমুখী।
তাহলে কুসংস্কার কী আর বিজ্ঞানই বা কী? যুক্তিহীনভাবে কার্যকারণ সম্পর্কে বিচার না করে বংশপরম্পরায় ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণাগুলোকে মানুষ যখন অন্ধভাবে বিশ্বাস করে, তাকে বলে কুসংস্কার। যুক্তিহীন অনুমান নির্ভরতা থেকেই কুসংস্কারের জন্ম হয়। আমরা যখন যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা বা বিচারের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি, তখন তা কুসংস্কারে পরিণত হয়। কুসংস্কার অর্থ হলো কোনো অজ্ঞাত বিষয়ে অহেতুক বা অযৌক্তিক ভয়। আর কোনোকিছু জানা থেকে জ্ঞান এবং কোনো কিছুকে বিশেষভাবে জানাকে বলে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানে কোনো বিষয়ে যুক্তিযুক্তভাবে কার্যকারণ সম্পর্ক বিচার করে, পরীক্ষা ও পর্র্যবেক্ষণ দ্বারা সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে গ্রহণ করা হয়। বিজ্ঞান শব্দটির অর্থ ‘বিশেষ জ্ঞান’। ইংরেজিতে বিজ্ঞানকে বলা হয় ঝপরবহপব। ল্যাটিন শব্দ ‘ঝপরড়’ এর অর্থ জানা। ‘ঝপরড়’ থেকে ‘ঝপরবহপব’ এসেছে।
একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে পারমাণবিক যুগে পৌঁছে ও মানবসমাজ কুসংস্কারমুক্ত হতে পারেনি। নানাবিধ অবৈজ্ঞানিক, যুক্তিহীন, ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণা সমাজজীবনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। প্রাচীনকালের তুলনায় তা অনেকটা অহরহ দেখা যায়। মনবজীবনে প্রচলিত কুসংস্কারগুলি ধর্মীয়, সামাজিক, ব্যাক্তিগত ইত্যাদি। সুপ্রাচীনকাল থেকে নরবলি, সতীদাহ প্রথা ছিল। কিন্ত সমাজ সচেতনতার ফলে সেগুলো আইন করে বন্ধ করে দেয়া হয়। তারপরও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে কোন কোন জায়গায় এগুলো ঘটতে দেখা যায়। যেমন ১৯৮৭ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজস্থানে দেওবালায় রূপকানোয়র নামে এক অষ্টাদশী তরুণীকে স্বামীর চিতায় জোর করে তুলে দেয়া হয় এবং পুড়িয়ে মেরে সতীদাহের নয়া নিদর্শন স্থাপন করা হয়। তাছাড়া ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতাও কুসংস্কারের পর্যায়ে পড়ে। আর এ জন্য যুদ্ধ বিগ্রহ ও হানাহানি অতীতেও হয়েছে এবং বর্তমানেও কম হচ্ছে না। এ কারণে কবিগুরু আক্ষেপ করে বলেছিলেন—
“ধর্মের বেশে মোহ এসে যারে ধরে
অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে”।
আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও নিয়ত কুসংস্কার আমাদের জাপটে ধরেছে। যেমন ঘর থেকে বেরোনোর সময় চৌকাঠে বাধা, এক শালিক বা দুই শালিক দেখা, হাঁচি-টিকটিকি, হাতের রেখার প্রভাব, পরীক্ষার দিন ডিম-কলা না খাওয়া, গভীর রাতে ভূতের উপস্থিতি, গ্রহ-নক্ষত্রের অলীক প্রভাব থেকে পরিত্রাণের জন্য ধাতব আংটিতে পাথর ব্যবহার নিয়ে নানা কাহিনী প্রচলিত আছে। রাজধানী ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে ‘ভূতেরগলি’ নামে এখনো একটি গলি রয়েছে। তাছাড়া ঝাড়-ফুঁক, তেলপড়া, পানিপড়া, তন্ত্র-মন্ত্র, যাগযজ্ঞ, মাদুলী ধারণ, স্বপ্নাদিষ্ট ঔষধ রোগের চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রোগী না মরলে তাকে ডাইনী বলেও ঘোষণা করা হয়। রোগীকে বিশেষ করে মহিলা রোগীকে যেভাবে নির্যাতন করা হয়, তাতে রোগী অনেক সময় মারাও যায়। যখন আমরা বিজ্ঞানের আশীর্বাদে মোবাইল, কম্পিউটার, ল্যাপটপ প্রভৃতি প্রযুক্তির মাধ্যমে গোটা বিশ্বাসকেই হাতের মুঠোয় লাভ করেছি এমনকি শিক্ষিত খেলোয়াড়রাও মাঠে নামার আগে মাঠপ্রণাম, সূর্যবন্দনা করেছে। মুখে প্রগতির
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments