আধুনিক চিত্রকলা ও জনগণ
প্রথমে দেখা যাক, আধুনিক চিত্রকলা বলতে পারা যায় কাকে? এ ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তিকে ধরে এগিয়ে যাওয়া যেতে পারে। “শেষ সপ্তক” কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ একটি কবিতায় বলেছেন,
জগতে রূপের আনাগোনা চলেছে
সেই সঙ্গে আমার ছবিও এক একটি রূপ
অজানা থেকে বেরিয়ে আসছে জানা দ্বারে
এরা প্রতিরূপ না।
রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবিগুলিকে তাঁর এই উক্তির সঙ্গে মিলিয়ে দেখে আমরা প্রথমে চিত্রকর রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে পারি এবং তারপরে আধুনিক চিত্রকলার মর্ম কথাটতেও পৌঁছতে পারি। রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবি দেখে যেকথা প্রথমেই মনে হয় সেটা এই যে, পঞ্চভূতের রামধনু-দুনিয়া তাঁর তুলির পোঁচে পোঁচে হয়েছে কিম্ভূত। শুধু তাই নয়, ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থের গদ্য-কবিতাগুলিতে যাখন রবীন্দ্রনাথ পারিপার্শ্বিকের এবং প্রতিবেশীদের অবিকুল ও অবিকৃত বাণীরূপ ফুটিয়ে তুলবার দিকে ঝুঁকে পড়েছেন ঠিক তখন তাঁর চেয়ে দেখা কোন মেয়ের মুখ কিংবা জীবের দেহকে তিনি ছবিতে একেঁছেন উদ্ভট করে। এই ছবিগুলি হয় অবিকল নয়, এরা অভিনব। ‘শেষ সপ্তক’ থেকে উদ্ধৃত উপরোক্ত পঙক্তি ক’টিতে যে ব্যতিক্রম ঘটানোর দাবি রয়েছে, তাকে তাই চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথের রূপসৃষ্টির মর্মবাণী বলা যেতে পারে। কিন্তু এই মর্মবণী কি একান্তভাবে চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথেরই একটা অভিনব প্রয়াসের বা খেয়ালের কৈফিয়ত? তা নয়। আধুনিক চিত্রকলার নমুনা যাঁদের খানিকটাও নজরে পড়েছে, তাঁরাই বলবেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর ছবির জগতে এক বিশেষ পরীক্ষার পতাকাবাহী। বলবেন রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবি কিংবা কৈফিয়ত ঊনিশ বিশ শতকের এবং বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালের চিত্রশিল্পীদের কাজের বিশেষত্বের প্রতিভূ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ছবির অঙ্গ’ নিবন্ধের মধ্য দিয়েও তাঁর আধুনিকতার প্রতি প্রবণতাকে ব্যক্ত করেছিলেন। এখানে তিনি ছবি এবং কবিতাকে অনেকটা সেইভাবে পাশাপাশি সাজিয়েছিলেন, যেমনভাবে সার্ত্রে ছবি এবং কবিতাকে পাশাপাশি সাজিয়ে বলেছিলেন যে, এরা উভয়েই অস্বচ্ছ (ঙঢ়ধয়ঁব)। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘বাহিরকে ভিতরের করিয়া দেখা ও ভিতরকে বাহিরের রূপে ব্যক্ত করা ইহাই কবিতা এবং সমস্ত আর্টেরই লক্ষ্য। ...ছবিতে যেমন বর্ণিকাভঙ্গং কবিতায় তেমনি ব্যঞ্জনা। এই ব্যঞ্জনার দ্বারা কথা আপনার অর্থকে পার হইয়া যায়। যাহা বলে তার চেয়ে বেশি বলে। এই ব্যঞ্জনা ব্যক্ত ও অব্যক্তর মাঝখানকার মীড়। কবির কাব্যে এই ব্যঞ্জনা বাণীর নির্দিষ্ট অর্থের দ্বারা নহে, বাণীর অনির্দিষ্ট ভঙ্গির দ্বারা অর্থাৎ বাণীর রেখার দ্বারা নহে, তাহার রঙের দ্বারা সৃষ্টি হয়।’ এই ধরনের সূত্র ধরেই আমরা বলতে পারি যে, চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথের কাজে যেমন, ঠিক তেমনি বিংশ শতাব্দীর রূপসৃষ্টি ও রূপ নিরীক্ষার মুখপাত্র হিসাবে অভিহিত চিত্রশিল্পীদের কাজে সাধারণত মানব মানবী ও তাদের পরিবেশের অবিকল বাইরের চেহারাটা একটা আবরণ বিশেষ। এই ধরনের শিল্পীরা যে সব ছবি আঁকছেন, বিষয়বন্তুর সঙ্গে তাদের সাদৃশ্যবিহীনতার মধ্য দিয়ে এই বক্তব্য বেরিয়ে আসছে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা বস্তুর আভ্যন্তরীণ সত্তাকে প্রকাশ করাই হচ্ছে এর মূলাধার বা সত্যরূপের উপস্থাপন। কোন ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতিরূপ হচ্ছে ছলনা মাত্র। পিকাসো তাঁর কিম্ভূতকিমাকার মূলাধারগুলিকে স্বাভাবিক বলে প্রতিপন্ন করতে চেয়ে বলেছেন, ‘দর্শকরা যেটাকে মনে করছেন অনাসৃষ্টি, আমার কাছে তাই রূপসৃষ্টি।’
আমাদের পারিপার্শ্বিক জগতের বিভিন্ন বস্তুকে অথবা নানান্ মানুষের মুখাবয়বকে আলো এবং রং’এর লীলা কিংবা ভাবের বিস্ফোরণ হিসাবে দেখে নিটোলভাবে কিংবা ভেঙে ভেঙে ছবিতে রূপ দেবার পদ্ধতি ঊনিশ বিশ শতকে উপরোক্ত প্রতিরূপ-লঙ্ঘী দৃষ্টিভঙ্গীকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই বিমূর্ত বা প্রতিরূপ লঙ্ঘী ধারা থেকে যে সব দুর্বোধ্য ছবি বেরিয়ে আসছে, সেগুলিতেই আধুনিক চিত্রকলার আধুনিকতার সন্ধান করা হচ্ছে সাধারণত, যদিও আধুনিক চিত্রকলার পরীক্ষা নিরীক্ষাগুলি প্রতিরূপকে সব সময়েই যে নাকচ করেছে তা নয়। আধুনিক চিত্রকলার প্রখ্যাত শিল্পীরা বিমূর্ত ছবির পাশাপাশি নিয়ে এসেছেন অবিকৃত মূর্ত প্রতিরূপকেও। তাঁরা এঁকেছেন অসংখ্য ও অজস্র প্রতিরূপ, যেগুলো উদ্ভট কিংবা কিম্ভূতকিমাকার তো নয়ই, বরং সুষমায় সুমিত ও আনন্দঘন ভঙ্গিমার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments