গিরিধারী প্রসাদ
সময়টা ছিল ১৯৪২ সাল। ঢাকা শহরের এক সামান্য দারোয়ান ছিল দ্বারভাঙ্গার গিরিধারী প্রসাদ। পটুয়াটুলির গলিতে সে কতকগুলো দোকান আর অফিসের রক্ষণাবেক্ষণ করতো। পটুয়াটুলিতে রাস্তার দুপাশে দোকান আর ছোট ছোট অফিস ছিল সে সময়ে ৷ জন বসতি ছিল না। দারোয়ানরা ছিল জিম্মাদার। গিরিধারী প্রসাদ ছিল এদের একজন। অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও সৎ, কিন্তু সামান্য মাইনের লোক ছিল সে।
সময়টা ছিল কিন্তু সঙ্গীন। অনেক হিসেব করে ভারতের কংগ্রেস-নেতৃত্ব ৪২ সালের ৯ই আগস্টের ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো’ প্রস্তাব পাশ করেছিলেন। নৈতিক দিক দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফ্যাসিবাদী হিটলার মুসোলিনী তোজোর নিন্দা করেছিলেন তাঁরা ; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজের অধীনে ফ্যাসিবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামাও সম্ভব নয় বলে জানিয়েছিলেন। ৯ই আগস্টের পূর্বাহ্নে কংগ্রেস নেতারা গ্রেপ্তার হয়ে যাওয়ায় লক্ষ লক্ষ নরনারী রেল লাইন উপড়ে ফেলা, টেলিগ্রাফের তার কাটা কিংবা পোস্ট অফিস জ্বালিয়ে দেওয়ার সারা উপমহাদেশব্যাপী লড়াইএ নেমে পড়েছিল। গান্ধীজী জেলে ঢুকবার আগে ধ্বনি দিয়ে গিয়েছিলেন, করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে। অবশ্য এই ধ্বনিটিকে আক্ষরিক অর্থে স্বয়ং নেতৃত্বও যেমন আঁকড়ে ধরেননি, তেমনি অনুগামীদের অনেকেই মরিয়া হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েননি। আন্দোলনের আটঘাট নেতারাও যেমন বেঁধেছিলেন, কর্মীরাও এবং সেইসঙ্গে জনতার বড় অংশও তেমনি আটঘাট বেঁধেছিলেন। যারা প্রাণ হাতে নিয়ে বিদ্রোহে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে যার যাকিছু জিম্মাদারি ছিল, সেগুলোকে তারা পেছনের সারির লোককে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। এ ব্যাপারটা যেমন সংঘের, তেমনি ব্যক্তিগত জিম্মাদারিতে প্রযোজ্য ছিল। অবশ্য কংগ্রেস নেতৃত্ব তাদের অন্যান্যবারের আন্দোলনের তুলনায় আটঘাট কম করে বেঁধেছিলেন সংঘগত ও ব্যক্তিগত উভয় ক্ষেত্রেই। সেজন্যেই বোধ হয় ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে সাধারণ মানুষ গ্রামে গঞ্জে বিদ্রোহে নিজস্ব উদ্যোগ বেশী নিয়েছিলেন।
ঢাকা শহরেও ঘটনাটা ঘটেছিল এই ধারাতেই। কংগ্রেসের নেতাদের গ্রেপ্তার হবার খবর পেয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা ১০ই আগস্ট কোর্ট-কাচারির ওপর চড়াও হয় এবং শহরে টেলিগ্রাফের তারগুলোকে কিছুক্ষণের মধ্যে কেটে দেয়। শহরের একটা দিকে রাস্তায় রাস্তায় তার ছড়িয়ে থাকে।
শহরটা বস্তুতপক্ষে জনতার দখলেই চলে গিয়েছিল। সেনাবাহিনীর একটা দল আর সশস্ত্র পুলিশ কোর্ট-কাচারি রক্ষায় ব্যস্ত ছিল। তবে তারা তার কাটায় নিয়োজিত বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর নজর রাখতো এবং বড় রাস্তায় গুলী ছুঁড়েছিল বেধরক।
তারা ঘনবসতিতে ঢুকতে চেষ্টা করেনি। বিক্ষুব্ধ জনতা নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করেছিল। ইট আর পাথর ছিল জনতার বড় অস্ত্ৰ ৷
আগের রাতে অঝোর ধারায় শ্রাবণের ধারা ঝড়ে পড়েছিল পুবে গ্যাণ্ডারিয়া, ফরিদাবাদ থেকে পশ্চিমে নবাবগঞ্জ পর্যন্ত বুড়ীগঙ্গার অববাহিকা বরাবর লম্বাটে ঢাকা শহরের অসংখ্য মহল্লায় ৷ যখন তার কাটা হচ্ছিল, এবং যখন বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর সেনাবাহিনী ও পুলিশ গুলী চালাচ্ছিল, তখনও মাঝে মাঝে শ্রাবণের ধারা ঝরে পড়ছিল। কিন্তু জনতার বিদ্রোহী মনের আগুন তাতে মোটেই নেভেনি। গুলী করেই সেনাবাহিনী ও পুলিশের লোকেরা চলে যাচ্ছিল, সেইজন্যে যারা গুলীতে মারা যাচ্ছিল, তাদের লাশ থেকে যাচ্ছিল জনতার অধিকারে।
জনতা একেক জায়গায় চারজন পাঁচজন নানাবয়সী লোকের লাশ সনাক্ত করছিল। পরিবার পরিজনের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিল। কারও না কারও চেনা শোনার মধ্যেই ছিল এইসব লাশ ৷
পটুয়াটুলির গলিতে প্রচণ্ড বিক্ষোভ হয়েছিল। গুলীও চলেছিল নিদারুণ ৷ তবে এই গলিটা ছিল জনবসতির বাইরে। সেইজন্যে এখানে লাশ সনাক্ত করতে অসুবিধা হচ্ছিল। লড়াই থেমে যাবার পরে যাঁরা দলবেঁধে লাশগুলোকে জড়ো করছিলেন এবং সনাক্ত করছিলেন তাঁরা এক জায়গায় কয়েক মুহূর্ত ভাবলেন, এর কি করা যায়?
দেখা গেলো, দারোয়ান ধরনের একটি লোক চিৎ হয়ে মরে পড়ে আছে। পরনে খাটো ধুতি আর ফতুয়া। আর হাতের মুঠোয় তখনও একটা ঝামা ইটের বড় টুকরো। তার কোমরে বাঁধা এক গোছা চাবী।
সমস্ত দোকান পাট তখন বন্ধ। বুঝতে পারা গেল, কাছাকাছি অনেকগুলি
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments