দস্তয়েভস্কি : দিন বদলের পালায়
উনিশ শতকের রুশকথাশিল্পী ফিওদর দস্তয়েভস্কি সম্বন্ধে ‘উপন্যাসের তত্ত্ব গ্রহে হাঙ্গেরীর মার্কসবাদী সৌন্দর্যতত্ত্ববিদ গিওর্গি লুকাচ ১৯১৪ সালে লিখেছিলেন যে, দস্তয়েভস্কি অনাগত লেখক লেখিকাদের জন্যে এক নতুন ধরনের বাস্তববাদের খসড়া রেখে গিয়েছেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি এই ‘খসড়াগুলো’ সমগ্র বিশ শতকের বিশ্ব সাহিত্যের প্রাণবন্ত ধারা হিসেবে আজও সক্রিয়। বাংলা সাহিত্যের কল্লোল যুগের গল্পে উপন্যাসে দস্তয়েভস্কির উপন্যাস ‘ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট’ এবং ‘দি ইডিয়ট’ উদ্দাম মানবতাবাদী যৌবনের ভাবের ঘোর যুগিয়েছিল। সেই থেকে দস্তয়েভস্কির গল্প-উপন্যাস বাংলাভাষী পাঠক-পাঠিকাকে টানে তাঁর এই পরিচিতিকে সামনে রেখে। বিশ্ব সাহিত্যে বিশেষ করে বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের দিনবদলের পালায় তাঁকে ঘিরে যে ভাবাদর্শের লড়াই চলছে সেটাই বর্তমান নিবন্ধের আলোচ্য বিষয়।
দস্তয়েভস্কির কষ্টিপাথরে সাহিত্যে একদিকে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী এবং অন্যদিকে সমাজতন্ত্রবাদী-সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্যকে কিছুটা ফুটিয়ে তোলাও এই আলোচনার অন্যতম উদ্দেশ্য।
II ১ II
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সমাজতন্ত্রের প্রসার ও জাতীয় মুক্তির প্রবাহকে ঠেকাবার জন্যে সাম্রাজ্যবাদীরা কমিউনিজমের ভাবাদর্শের বিরুদ্ধে যুগপৎ ঠাণ্ডা ও গরম লড়াই চালিয়ে আসছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যেতে পারে, দক্ষিণ আফ্রিকাতে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে গণ অভ্যুদয়কে স্তব্ধ করার জন্যেই পঞ্চাশের দশকে শাসকচক্র আইন করে কমিউনিজমের প্রচারকে নিষিদ্ধ করেছিল। এরা এই লড়াইয়ে সাহিত্যকেও একটা বড় রকমের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
আইরিশ জোটনিরপেক্ষতাবাদী বুদ্ধিজীবী ও রাষ্ট্রনীতিবিদ কোনার ব্রু ইজ ও'ব্রায়েনের লেখা ‘রাইটার্স এণ্ড পলিটিক্স’ বইটিতে এই সাহিত্যের ঠাণ্ডা লড়াই-এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। বইটির ১৯৬৫ সালের সংস্করণে ‘দুই ভল্লুক’ নামের নিবন্ধে ও'ব্রায়েন জনৈক মার্কিন লেখকের ‘দস্তয়েভস্কি অথবা তলস্তয়’ নামক গ্রন্হের একটা সারমর্ম দাখিল করেছেন। সারমর্মটা হলো এই যে, গ্রন্হকারের মতে তলস্তয় ও বলশেভিকদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তলস্তয় বলশেভিকদের মতো বিশেষ কতগুলো নীতির কাঠামোতে জনগণকে কায়িক ও মানসিকভাবে গড়ে তুলতে চান। দস্তয়েভস্কি এই ধরনের কাঠামোর বিরোধী। ‘দস্তয়েভস্কি অথবা তলস্তয়’ গ্রন্থের লেখক তলস্তয়কে বস্তুতপক্ষে খ্রীষ্টবিরোধী এবং প্রকারান্তরে বিধাতাপুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকামী হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁকে বলশেভিকদের সঙ্গে একাত্ম করে দেখিয়েছেন। তিনি দস্তয়েভস্কিকে খ্রীষ্ট ও ঈশ্বরের একাগ্র অনুগামী এবং মানবতাবাদের উদার প্রতিভূ হিসেবে উপস্থিত করেছেন। এইভাবে দস্তয়েভস্কিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের এবং কমিউনিজমের বিরুদ্ধে ভাবের লড়াইতে নিয়োজিত করা হয়েছে।
ও'ব্রায়েন তাঁর নিজস্ব জোটনিরপেক্ষতাবাদী বিচার বিবেচনা দ্বারা ‘দস্তয়েভস্কি অথবা তলস্তয়’ গ্রন্হের তলস্তয়বিরোধী যুক্তিগুলোকে খণ্ডন করেছেন। তিনি বলশেভিকদের সমর্থনে কিছু বলেন নি। তবে ঠাণ্ডা লড়াই-এর পশ্চিমী প্রবক্তারা কি সাংঘাতিক অজ্ঞতা ও অন্ধতা এবং যুক্তিহীনতার আশ্রয় নিতে পারেন, সেদিকটাকে প্রকটভাবেই তুলে ধরেছেন। আমরা এখানে ও'ব্রায়েনের বিশ্লেষণের বিস্তারিতে যাব না। এখানে শুধু কিভাবে দস্তয়েভস্কিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তার একটা নমুনা দেয়া হলো মাত্র।
দস্তয়েভস্কিকে পশ্চিমী স্নায়ু যুদ্ধবিদরা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে এবং সাধারণভাবে কমিউনিজম তথা মার্কসবাদী লেনিনবাদী ভাবাদর্শের বিরুদ্ধে আরও বহু কায়দায় ব্যবহার করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বছরগুলিতে অস্তিত্ববাদী দর্শনের যেসব প্রবক্তা পশ্চিমী স্নায়ু যুদ্ধের পরিচালকদের খপ্পরে পড়েন, তাঁরা দস্তয়েভস্কিকে তাঁদের পথিকৃত বলে ঘোষণা করেন এবং দস্তয়েভস্কির উপন্যাস ও গল্পের ব্যাখ্যাও করেন সেইভাবে। তাছাড়া, ঠাণ্ডা লড়াইয়ের তাত্ত্বিকরা ব্যাপকভাবে প্রচার চালান যে, সোভিয়েত ইউনিয়নে দস্তয়েভস্কি বর্জিত, উপেক্ষিত ও প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। এই প্রচারও নানা ধরনে করা হয়েছে। কখনও বলা হয়েছে, সোভিয়েত রাষ্ট্রের নায়করা দস্তয়েভস্কিকে শুরু থেকেই বাতিল করে দিয়েছেন। আবার কখনও বলা হয়েছে যে, শুরুতে সম্মান দেখানো হলেও পরে তাঁকে একেবারে মুছে ফেলা হয়েছে। পশ্চিমী প্রচারে এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে, দস্তয়েভস্কি পৃথক মতের, পৃথক ভাবাদর্শের মানুষ। অর্থাৎ তাঁর সঙ্গে ‘ডিসিডেন্টের’ মতো ব্যবহার করা হয়েছে। এইভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে যাঁরা ডিসিডেন্ট হিসেবে মাঝে মাঝে উদ্ভুত হয়ে থাকেন, তাঁদের উঁচু শিল্পী ও বিজ্ঞানীর জাতে তুলবার জন্যে পশ্চিমী তাত্ত্বিকরা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments