কার পায়ের খুন গো
৭১-এর ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণাকারী শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দী করে কামান বন্দুকের জোরে হত্যা আর অগ্নিকাণ্ড চালিয়ে বিদ্রোহী ঢাকা শহরটাকে দখল করেছিল। তারপর পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে গণ অসহযোগী সারা বাংলাদেশকে বাগে আনবার জন্যে এক সপ্তাহ না যেতেই প্রথম পর্যায়ে নরসিংদীতে হানা দিয়েছিল পাকিস্তানী সেবর জেট প্লেনের জঙ্গী বিমান বহর ৷
দিন পনেরো পরে দিনদুপুরে সেবর জেট প্লেন হানা দিয়েছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে। ৪০ মিনিট ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আকাশে। দু’তিন মিনিট অন্তর অদৃশ্য হয়ে আবার ঘুরে ঘুরে এসে ডাইভ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কেন্দ্রে মেসিনগানের গুলি ছুড়ে ওপরে উঠে যাচ্ছিল।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চারপাশের কয়েক মাইলের মধ্যে সমস্ত গ্রামে তখন মনে হচ্ছে, প্লেনগুলো এই বুঝি ঝাঁপিয়ে পড়লো তাদের ওপরেও।
এমনি একটা গ্রামে সেই মুহূর্তে গ্রাম্যপথে কয়েকটা সাইকেল রিক্সার আরোহী আর চালকরা বাঁশবনে আশ্রয় নিয়েছিল। রিক্সাগুলো পড়েছিল পথের ওপর। সামনে একটা বড় পুকুর। গ্রামটা ছোট। গোটা তিরিশেক ঘর। বউঝিরা বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে এসে পুকুরে গলা পর্যন্ত ডুব দিয়ে ছিল। প্লেনগুলো ফিরে ফিরে আসা মাত্র জলে ডুব দিচ্ছিল কোন রকম শব্দ না করে ৷ তারা ভাবছিল, একটু শব্দ হলেই প্লেনগুলো তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে গুলি ছুড়বে। একটা শিশুর কান্না শোনা যাচ্ছিল না। বৃদ্ধরা হাতের ইশারায় অবস্থা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল পরস্পরের মধ্যে। কিশোর কিশোরীদের চোখগুলো আকাশের চারকোণায় ঘুরছিল। ভয়ের সঙ্গে মিশেছিল অদম্য কৌতুহল। কাচের চুড়ির শব্দ যাতে না হয় সে জন্মে বৌ-ঝিরা নিজেদের দু'হাতে দু'হাতের চুড়ি চেপে ধরেছিল।
এক সময়ে প্লেনগুলো চলে গেলো। পাঁচ মিনিট চলে গেলো। দশ মিনিট চলে গেলো।
একজন রিক্সাওয়ালা ছুটে গিয়ে রিক্সার বেল বাজিয়ে চীৎকার করে উঠলো, গেছে গ্যা ৷ গেছে গ্যা ৷
সেই মুহূর্তে স্তব্ধতা ভেদ করে পুকুরের মধ্য থেকে বহু কণ্ঠের একটা কান্নার রোল আকাশের মৌনতা চিরে ওপরে উঠে যেতে লাগলো।
তার পরেই বেরিয়ে এলো চীৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বৌ-ঝিরা তাদের কাচ্চা-বাচ্চা নিয়ে। গ্রামের বৃদ্ধরা পেছনে পেছনে উঠে এলো ক্ষীণ আর্তনাদ করতে করতে। একজন যাত্রী যেন নিজের মনের কাছে প্রশ্ন রাখলো, “প্লেনগুলো গেছে গ্যা। অরা কি হেইয়া দেইখ্যা খুশীতে কান্দে?”
আরেক দৃশ্য তখন ৷ ঐ বৌ-ঝিরা কাচ্চা বাচ্চা নিয়ে মাঠের মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া সাদা ধুলোর পথ ধরে ছুটতে শুরু করেছে। প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশজন। ছুটছে তেমনি চীৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে ৷ এক ছোকরা রিক্সাওয়ালা এই প্রহেলিকার জবাব দিল।
—এই গ্রামের মরদেরা সব প্রাতঃকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে গেছে কাজে কামে হ্যাগো লাইগাই কানতে আছিল ; হ্যাগো লাইগা ছুটছে এখন।
সামনে ছুটছে গ্রামের বৌ ঝি কাচ্চা বাচ্চা। চীৎকার ভেসে আসছে পেছনে পেছনে ধীরে ধীরে চলা রিক্সার আরোহী আর চালকদের কানে। এক সময়ে চোখের আড়ালে চলে গেল ঐ বৌ-ঝি কাচ্চা বাচ্চারা।
রিক্সাগুলো যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৌঁছলো, তখন শহরের রাস্তায় এখানে ওখানে জটলা। বিশেষ করে কোর্ট কাচারীর এলাকায় প্লেনগুলো মেসিনগানের গুলি চালিয়েছিল। এর মধ্যে গুজব ছড়িয়ে গিয়েছে। কেউ বলছে, একটা প্লেনকে গুলী করে নামিয়েছে মুক্তিযোদ্ধারা। কেউ বলছে, মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে মারা গেছে।
চীৎকার হচ্ছে, লাশ কই। হাসপাতালে নিছে নাকি কারোরে? কয়জন গ্যাছে?
ইতিমধ্যে কয়েকটি পরিবার পোটলা পুটলি নিয়ে শহর ছেড়ে বাইরে যাবার জন্যে রাস্তায় রিক্সায় উঠে পড়ে তাড়াতাড়ি চালাবার জন্যে তাগিদ দিচ্ছে।
কিন্তু যেতে হবে ঘুরে। রাস্তায় এবার কিছু লোক বসে পড়েছে। যেসব মরদের খোঁজ করছিল গ্রামগুলোর বৌ-ঝিরা, তাদের দু একজনের সাক্ষাৎ পাওয়া গিয়েছে।
এমন সময় একটা তীক্ষ্ণ চীৎকার শোনা গেল এক কিশোরের, ইস্ দেখছো। রক্তের পাড়া। দৌড়াইয়া গেছে কেডা। মনে লয়, পায়ে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments