অব্যাহত অবিভাজ্য অপরিহার্য প্রতিনিয়ত নজরুল
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য ও সঙ্গীত এবং সাধারণভাবে সাহিত্যসৃষ্টির বৈচিত্র্য ও বহুত্বকে একটি বৃক্ষের শাখা প্রশাখা হিসাবে না দেখে একেবারে পৃথক করে করে কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে আমাদের যার যার পছন্দমত বেছে নেবার একটা ঝোঁক তাঁর কাজের সামগ্রিকতাকে আড়াল করে দেয় এবং উৎকর্ষকে খণ্ডিত করে। অযৌক্তিক হলেও দুঃখের বিষয়, এটাই ঘটেছে বিশেষ করে চল্লিশের দশকে। এই বিভাজন ও তার ঝোঁকের মূলে কি কি কারণ রয়েছে এবং এদের অতিক্রম করার জন্যই বা কি কি পদক্ষেপ নেয়া, হয়েছে, আমরা এদের এখানে সংক্ষেপে খতিয়ে দেখছি এক এক করে। আমাদের মূল লক্ষ্য নজরুলের অব্যাহত ও অবিভাজ্য সত্তাটিকে প্রতিষ্ঠিত দেখা।
নজরুলের বিভাজনের জন্য হয়তো নজরুল নিজেও কিছুটা দায়ী। তিনি তাঁর দীর্ঘ ‘ঝড়' কবিতাটি লিখে বিশের দশকে ঝড়ের বেগে আধুনিকতম ধারার কাব্য থেকে শুরু করে নাটক উপন্যাস ও ছোটগল্প এবং গণসঙ্গীত ও প্রেম ও বিরহ মিলনের গান রচনার সামগ্রিকতা থেকে সরে এসে নিজেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুধুমাত্র বিরহ মিলন এবং আধ্যাত্মিক গানের ভুবনটিতে আবদ্ধ করলেন। তিরিশের দশকের প্রায় পুরোটাই তিনি গীতিকাব্যে তন্ময় হয়ে রইলেন এবং বাংলা গানের জগতে নিয়ে এলেন অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি। চল্লিশের দশকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তাই তিনি নিজে আর সামগ্রিকতায় ফিরতে পারলেন না।
আমরা প্রগতিবাদীরা কিংবা তাঁর অন্যান্য অনুরাগীরাও তাঁর সমগ্র কাজকে সামনে রাখতে পারিনি। আমরা যারা নজরুলকে শুধুমাত্র প্রেম ও বিরহমিলন ও আধ্যাত্মসঙ্গীত ও সুরসৃষ্টির কবিরূপে বেছে নেয়ার বিরোধিতা করেছি, তারা আবার নজরুলকে কেবলমাত্র গণসঙ্গীতের পুরোধারূপে অথবা ‘অগ্নিবীণা” ও ‘বিষের বাঁশি' কিংবা 'সর্বহারা', 'ফনিমনসা' ও 'সন্ধ্যা' কাব্যগ্রন্থের কয়েকটি বহুবিত কবিতাকে তাঁর কাব্যসত্তার পরিচয়রূপে সর্বসমক্ষে উপস্থিত করেছি এবং এইক্ষেত্রেও তাঁর কাব্যিক গুণগত উৎকর্ষ ও প্রয়াসকে জনমানসে তুলে ধরিনি। মার্কসপন্থী পণ্ডিত ও বাংলার অগ্নিযুগের বিপ্লবী ড. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত চল্লিশের দশকে তাঁর একটি নিবন্ধে বাংলা কাব্যে চণ্ডীদাসের পরে কয়েক শতাব্দী শেষে আবার সবার উপরে মানুষ সত্যকে উদাত্তকণ্ঠে ঘোষণা করায় কবিরূপে নজরুলকে অভিনন্দিত করেন। আমরা ড. দত্তের এই বক্তব্যে গভীরভাবে আলোড়িত হয়েছিলাম। স্বভাবতই নজরুলের উদাত্ত গণকণ্ঠকেই আমরা বড় করে দেখেছি। চণ্ডীদাসের মতোই নজরুলের কাব্যেও যে প্রেম ও বিরহমিলনের গানের দিকটাও বড়, সেটা আমরা একধরনের গীতি কবিতার সমঝদারদের এক্তিয়ারে ছেড়ে দিয়েছিলাম। এই সমঝদাররাও আলাদা করে একটি নজরুলগীতির ভুবন তৈরি করে নেন এবং আজও তাকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরে আছেন যে তাতে নজরুল কাব্যের কাড়ানাকাড়া অচ্ছত।
এইভাবে আমরা নজরুলের অনুরাগীরা কবিকে ভাগ করে নিয়েছিলাম। নজরুলের প্রতিপক্ষীয়রা এই সুযোগ ছাড়েনি। তারা ফাঁক খুঁজে আসছিল। জাতীয় স্বাধীনতা, শ্রমজীবী জনগণের আন্তর্জাতিক সংহতি, বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও আন্তর্জাতিকতা, সাম্য এবং সমাজতন্ত্র এবং ব্যক্তিক ও যৌথ মুক্ত ধর্ম ও কর্মজীবনের লক্ষ্যে নজরুল ছিলেন একরোখা ও আপসহীন সংগ্রামী। স্বভাবতই সাম্রাজ্যবাদী বিদেশী শাসকেরা যেমন তাঁর কাব্যকে পদে পদে খর্ব করার জন্য তাঁর গ্রন্থ নিষিদ্ধ করেছে, তাঁকে কারারুদ্ধ করেছে, তেমনি সঙ্গে সঙ্গে স্বদেশের কায়েমী স্বার্থবাদীরা নানাভাবে তাঁকে হেনস্তা করেছে। এতে অবশ্য নজরুলের বিপ্লবী কাব্যের গতি শ্লথ হয়নি। স্বাধীনতাসংগ্রামী স্বদেশবাসী তাঁকে বিপুলভাবে সমাদর করেছেন এবং তিনিও চারণের বেশে জনগণের জীবনের গান গেয়েছেন। বিশের দশকের শেষের দিকে বিশেষ করে গীতিকবিতা রচনা করার দিকে ঝুকলেও তিরিশের দশকেও তাঁর সামগ্রিক সৃষ্টির জনপ্রিয়তা জারি ছিল। কিন্তু চল্লিশের দশকে প্রতিপক্ষীয়রা তাঁর অসুস্থতার এবং সাধারণভাবে জনসাধারণের মধ্যে অনুপস্থিতির সুযোগে বিশেষ করে তাঁর কাব্যের গুণগত উৎকর্ষ ও সামগ্রিকতার উপর আক্রমণ চালায়। এরা তাঁর কবিতার কাজকে হতমান করার জন্য একটা আওয়াজ তোলে যে, নজরুল কাব্যে কিছু কিছু কবিতা নন্দনতাত্ত্বিক মানদণ্ডে টিকলেও সাধারণভাবে তাঁর কাব্যে গুণগত উৎকর্ষের অভাব রয়েছে। এরপরেই ধর্মের ভিত্তিতে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments