চল্লিশ দশকের ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলন : পূর্ববঙ্গ
১৯৩৯ সনের পূর্বেই পূর্ববঙ্গের ঢাকা ও অন্যান্য শহরে রাজনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে নতুন ধ্যানধারণার সূত্রপাত হয়েছিল। বৃটিশ কারাগারগুলোতে যেসব রাজবন্দী ছিলেন তাঁদের অনেকেই জেলে থাকাকালীন মার্কসবাদের দিকে ঝোঁকেন এবং জেলের বাইরে এসে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। ট্রেড ইউনিয়ন ও কৃষক সভাকে কেন্দ্র করে নতুন জীবন্ত প্রগতিশীল আন্দোলন সংগঠিত হতে থাকে এবং অল্প সময়ের মধ্যে লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের একটি গরিষ্ঠ অংশ, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রগতিশীল চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত হন। এঁদের মধ্যে যেমন পুরোপুরি কমিউনিস্ট মতবাদের সমর্থক লেখক ছিলেন তেমনি অকমিউনিস্ট, সাধারণভাবে মানবতাবাদী বা হিউম্যানিস্ট লেখকও ছিলেন। এইসব লেখকদের সহায়তায় ঢাকায় প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ স্থাপিত হয় ১৯৩৯ সনেই। ঐ বছরেই, সকলেরই জানা আছে, সাম্রাজ্যবাদী বৃটেন ও নাৎসী জার্মানির মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই বাঙালি লেখকরা ভারতের ও পৃথিবীর নানা দেশের সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের মতোই ফ্যাসিবাদের মারাত্মক আক্রমণ সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছিলেন। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লেখকদের সহযোগে গঠিত আন্তর্জাতিক বিগ্রেড গঠনের ঘটনাটি বাঙালি শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি কর্মীদের বেশ খানিকটা অনুপ্রাণিত করেছিল। স্পেনে গণতন্ত্রীদের পতন হবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা উপলব্ধি করতে পারলেন যে ফ্যাসিস্টদের নগ্ন আক্রমণের বিরুদ্ধে আরো জোরদার ও মজবুত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
পূর্ববঙ্গে ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ছিল ঢাকা। প্রধানত সেখানেই লেখকরা সংগঠিতভাবে এই ধরনের আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলেন। শ্রীহট্ট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর এবং অন্যান্য জেলায় প্রধানত কমিউনিস্ট পার্টির শ্রমিক ইউনিয়ন ও কৃষক সভার মাধ্যমে এই আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল। কিন্তু শ্রীহট্ট ছাড়া ঢাকা জেলার বাইরে লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের স্বাক্ষর তেমন পাওয়া যায় না। শ্রীহট্ট থেকে প্রকাশিত এবং কালীপ্রসন্ন দাশ সম্পাদিত ত্রৈমাসিক ‘বলাকা’ পত্রিকাটি প্রগতি সাহিত্যের ভাবধারাকে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছিল। বলা বাহুল্য, ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে তৎকালীন বাঙালি লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে আসা খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ গোড়ার দিকে ছিল পুরোপুরি একটি সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ; বৃটেনের এই যুদ্ধে হার হলে ভারত তার বহু আকাক্সিক্ষত স্বাধীনতা পেয়ে যাবে এই মনোভাব থেকে অনেকেই নাৎসী জার্মানির আপাতসাফল্যকে খুবই উৎসাহের সঙ্গে সমর্থন জানাতে শুরু করেছিলেন। তৎকালীন বৃটিশ সরকারের অমানুষিক দমন-পীড়ন এই মনোভাবকে আরো দৃঢ় হতে সাহায্য করে।
১৯৪২ সালের ৮ মার্চ এই সভায় যোগদানের পথে সোমেন চন্দ নৃশংসভাবে খুন হন। ...এই সময়ে সোমেন চন্দ লাল পতাকা হাতে রেল শ্রমিকদের একটি মিছিল নিয়ে সম্মেলন মণ্ডপের দিকে আসছিলেন। সম্মেলনের উপর আক্রমণের পরিচালকরা এই মিছিলটির উপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং সোমেন চন্দকে পৈশাচিকভাবে হত্যা করে। সোমেন চন্দ অবশ্য লাল পতাকাটি হাত থেকে ছাড়েন নি।
১৯৪১ সনের ২২ জুন হিটলারের নাজি বাহিনী তার সমস্ত শক্তিতে সোভিয়েত দেশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে যুদ্ধের আগুন অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে সমস্ত ইয়োরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রকৃতি সম্পর্কেও নতুন করে চিন্তা করার প্রয়োজন হয়। ঢাকা শহরে প্রগতি লেখক সংঘের একটি বর্ধিতায়তন সভায় সারা পৃথিবীর সমাজতন্ত্রের তৎকালীন একমাত্র প্রাণকেন্দ্রের সপক্ষে, ফ্যাসিস্ট যুদ্ধবাজদের হঠকারী আক্রমণের বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করার সিদ্ধান্তই প্রগতি লেখকরা গ্রহণ করেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদকে ধ্বংস করবার জন্যেই হিটলারের জঙ্গী বাহিনীকে পরাজিত করা দরকার এ কথাটা সাধারণ মানুষকে বুঝিয়ে দেবার জন্যে প্রগতি লেখকরা বিভিন্ন স্থানে ছাত্র ও যুবদের সভা সংগঠিত করতে শুরু করেন। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রাজশাহী, মুন্সীগঞ্জ এবং অন্যান্য স্থানে বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলন রূপ পেতে থাকে।
চল্লিশ দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন হিটলারের বর্বর বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হবার অল্পকালের মধ্যেই ঢাকা শহরে সংগঠিত হয়েছিল ‘সোভিয়েট সুহৃদ সমিতি’। এই
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments