নকল

আফিয়ার আব্বা গম্ভীর প্রকৃতির লোক। চেহারাটা ভারি, বৃহৎ বাঁকা নাক। আর চোখদুটি অদ্ভুত রকম স্থির। কখনো-কখনো তাতে গাম্ভীর্য বা বিরক্তি ঘনিয়ে ওঠে বটে, কিন্তু হাসির উচ্ছলতা তাতে ধরা পড়ে না।

ছোটবেলায় আব্বার সঙ্গে আফিয়ার তবু ঘনিষ্ঠতা ছিল। আদর করে কথা কইতেন, মিষ্টি করে হাসতেন। তাছাড়া প্রয়োজন হলে শাসনও করতেন। বাড়িতে পয়সা চুরি যাওয়ার ব্যাপারটা এখনো স্পষ্ট মনে আছে তার। সেবার মুন্নু, রেজিয়ারা এসেছিল। ওরা আত্মীয় বটে, কিন্তু বিদেশে তারা থাকত বলে আগে কখনো দেখেনি তাদের। মেহমান পেয়ে আফিয়ার আনন্দ হল, ভাব করল তাদের সঙ্গে। কিন্তু দুয়েক দিন পরে বুঝলে ওদের যেন কেমন ছ্যাঁচড়া অভ্যাস, এটা-সেটা চুরি করবার ঝোঁক। আব্বা বরাবর বাড়িতে পয়সা সম্বন্ধে উদাসীন। বলেন, বাড়িতে যদি পয়সা ছড়িয়ে নির্ভয়ে থাকতে না পারলাম তবে বাড়ি আর বাড়ি হল কোথায়? একদিন যখন একটা টাকা চুরি গেল এবং এই নিয়ে আব্বা রেগে গেলেন তখন আফিয়া এক সময়ে আস্তে গিয়ে আব্বাকে বললেন—আব্বা, মুনু টাকা নিয়েছে।


আমাদের এই যে জীবন এ-জীবনের সত্যিকার কোনো অর্থ হয় না। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত আমরা নকল। ভাগ্য ভালো আমরা যে নকল একথা বুঝতে পেরেছি।


তার চোখে হয়তো কিছু ছিল। তাই তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্ত তার পানে তাকিয়ে বললেন, তুমি দেখেছ নিতে?

—না।

—তবে কী করে জান ও নিয়েছে?

আফিয়া তখন ছোট বলে বুদ্ধি গুলিয়ে গেল। যদিও সে মুনুকে টাকা চুরি করতে দেখে নি, কিন্তু তারই যে একাজ এ-বিষয়ে যে করেই হোক সে নিঃসন্দেহ ছিল। কিন্তু প্রমাণ নেই। ভেবে একবার ঢোক গিলে বললে,—মনে হয়।

আব্বা আবার কয়েক মুহূর্ত তার পানে চেয়ে রইলেন। হয়তো ভাবলেন কিছু, তারপর বললেন, মনে হয় কোনো কথা নয়। ধর, আমার মনে হয় এ তোমার কাজ।

আফিয়া অস্থির হয়ে উঠল। যে-ধারণার সত্যতা সম্বন্ধে এত নিঃসন্দিগ্ধ ছিল, তা কেবল ব্যক্ত করে এমনি প্যাঁচে পড়ে যাবে সে ভাবতেই পারে নি। তাছাড়া আম্বার শেষোক্ত কথায় হঠাৎ তার অভিমান উথলে উঠল। কী করে আব্বা এই কথা বলতে পারেন?

আব্বা এখনো কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তার পানে, তার চোখের ভাবে তাঁর চোখের কিছু পরিবর্তন হল না। তিনি আবার দৃঢ়কণ্ঠে বললেন—বল মেয়ে, কথা বল। আমার মনে হয় একাজ তোমার, তুমি এর উত্তরে কী বল? এরপর অকস্মাৎ আফিয়ার মনে লড়াই শুরু হল। কী যে প্রাণপণে সে দমাতে চেষ্টা করল প্রথমে বুঝলে না। কিন্তু কান্না যখন ঠেলে বেরিয়ে এল তখন সে নিজেকে শিথিল করে দিল। আব্বা তাকিয়ে দেখলেন, বুঝলেন কেন এই কান্না, মেয়ের বুকে কোথায় সবচেয়ে বেশি আঘাত লেগেছে। সবল হাতে আস্তে তাকে কাছে টেনে এনে মাথায় এক হাত রেখে অতি ধীরে-ধীরে অথচ দৃঢ়ভাবে বললেন, তোমাকে আদর করছি, কারণ তুমি কিছু গুরুতর দোষ কর নি। কিন্তু একথা মনে রেখো স্ব-চোখে কিছু না দেখে কখনো কারো নামে একটি কথা বোলো না। এবং স্ব-চোখে দেখলেও অকারণে তুমি যে লোকের কাছে বলে বেড়াবে, সেটিও ঠিক নয়।

বলে তিনি এক কুটনী বুড়ির গল্প শোনালেন। এবং শুনতে-শুনতে আফিয়ার কান্না চোখেই শুকিয়ে গেল। অশ্রুকে আব্বা কোনোদিন বেশি আমল দেন না, কাজেই ওর মোছামুছির ব্যাপারে তিনি বরাবর নিরুৎসাহ। তাছাড়া বাইরের চোখের পানি সম্বন্ধে সজ্ঞান করে না দিয়ে বরঞ্চ ভেতরের আসল সত্তাকে টেনে আনেন বাইরে।

বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে-সঙ্গে সম্বন্ধটা কেমন অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার চরিত্রগঠন ব্যাপারে তাঁর কর্তব্য শেষ হয়েছে বলে তিনি এখন মেয়ের সম্বন্ধে নির্লিপ্ত। মেয়েও যে বিনা প্রয়োজনে বাপের কাছে ঘেঁষে যায় তাও নয়। কখনো-কখনো তার ইচ্ছে করে

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

৯৯

এক মাস

৯৯

৩০

মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

আজকের কুইজ

[কুইজে অংশ নিয়ে জিতে নিন এক মাসের ফ্রি সাবক্রিপশন]

এ সপ্তাহের জরিপ

Readers Opinion

Editors Choice