মৃত্যু
খান সাহেব বদরুদ্দিন সেকেলে মানুষ। যে-যুগে তিনি অধ্যয়ন শেষ করেছেন তখন ডিপুটি মুনসেফ হওয়াটা প্রায় রাজা-বাদশা হওয়ার মতো ছিল মুসলমান সমাজে, এবং কর্তৃপক্ষরা কোনো প্রকারে চলনসই লোক পেলে এসব সরকারি চাকরিতে নিয়ে নিতেন; কাজেই তিনি যে মফস্বল শহরের একপ্রান্তে টিন-তর্জার ঘরে মক্কেলদের আশায় ওকালতি-ব্যবসা ফাঁদলেন তা সে-পথের মোহেও নয়, সরকারি গোলামি না করে স্বাধীন থাকবার প্রেরণায়ও নয়। বস্তুত কোনো পথ ছিল [না] বলেই এবং মেসের বাড়িতে থেকে চৌকিতে মোটা বালিশে তেল চকচকে আশৈশব থলথলে শরীরটা এলিয়ে বার কয়েক চেষ্টার পর আইন পরীক্ষার শেষ-তোরণ অতিক্রম করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি ওকালতির পথ ধরেছিলেন।
শেষ পর্যন্ত কিন্তু ব্যবসা মন্দ ফাঁদেন নি। মক্কেলরা ক্রমশ ভিড় করতে লাগল। তবে যে-মক্কেল হারজিতের দিকে লক্ষ্য না রেখে অর্থ ব্যয় করবে বলে দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ তারা তাঁর ক্যানেস্তারায় লেখা মুছে যাওয়া প্রায় নামের সাইনবোর্ডে বেশি আকৃষ্ট হত না। যারা ঠেকায় ঠেকেছে, অথচ সংগতি নেই যে আইন-আদালতের ছায়া মাড়াবে স্ব-ইচ্ছায়, তারাই তাঁর বৈঠকঘরে কাঁঠালকাঠের বেঞ্চিতে এসে ঝুঁকে বসত দাতব্য চিকিৎসালয়ে হতাশ-রোগীর ভঙ্গিতে। কাচ ভাঙা আলমিরায় তাঁর মোটামোটা সময়ে অনুকার হয়ে ওঠা আইনি-কেতাবগুলো দেখত, দেখত ওষুধের মতো এরা, হয়তো-বা আশা-মিশ্রিত শ্রদ্ধা জাগত খান সাহেবের প্রতি।
তারপর হঠাৎ তাঁর খেয়াল হল : সে-সর্বগ্রাসী আগুন কোথায় গেল, যে-আগুনকে তাজিয়ে রাখবার জন্য চেষ্টা করেছেন দিনের পর দিন? তাঁর অন্তর ঠাণ্ডা। কোনো ক্রোধ নেই। আমেনা খাতুন মাফ করে মারা গেলেন।
পসার জমাবার আগেই অবশ্য বদরুদ্দিন সাহেব ঝুনো উকিলের কায়দা-কানুন শিখে ফেলেছিলেন। সেটি সম্ভব হয়েছিল নিজের কাজের অভাবের জন্য। সহকর্মীরা যখন আপন কাজে ব্যস্ত তখন তিনি পরকে দেখেই সময় কাটান আর আকাশকুসুম রচনা করেন। আকাশকুসুম আকাশে না হয়ে অযাচিতভাবে অন্যখানে অন্যরূপে প্রতি বৎসর ফুটতে লাগল : প্রতি বৎসর নিয়মিতভাবে, ব্যতিক্রমশূন্যভাবে তাঁর স্ত্রী সন্তান প্রসব করতে লাগলেন।
তাঁর স্ত্রী আমেনা খাতুন কোন্ কালের মানুষ বলা মুশকিল, কিন্তু দুনিয়া সম্পর্কে তাঁর সম্পূর্ণ অসচেতন উদাসীনতার জন্য বলা যেতে পারে তিনি কোনো কালেরই মানুষ নন। স্বামী বৈঠকখানায় কী করেন, বা বাইরে ঝোলানো সাইনবোর্ডটার উদ্দেশ্য কী—সে-সব কথা নিয়ে চিন্তা করা তাঁর ধাতে নয়। তাছাড়া প্রতি বৎসর সন্তান জন্মলাভ করবার ফলে বেচারি হাঁফ ছাড়বারও ফুরসত পান নি, একটি বুকের দুধ খেয়ে একটু হাঁটি-হাঁটি পা-পা করতেই হঠাৎ ট্যা করে চোখ বোজা মাংসের পিণ্ড আরেকটি অতিথির আগমন হয়েছে। কাকে রেখে কাকে নেন, আবার কাউকে রেখেও চলে না।
এলোপাতাড়ি দিশেহারা দিনগুলো কাটিয়ে এক শান্ত অপরাহ্নে পৌঁছে হঠাৎ তিনি যেন দুনিয়া আবিষ্কার করলেন, তিনি নিজেকে খুঁজে পেলেন, বাঁচার প্রয়োজন ও জীবনের অর্থও যেন তাঁর কাছে প্রতিভাত হল মামুলি ধরনে। সেদিন এ-পরিবারে একটি স্মরণীয় দিন। খান সাহেব বদরুদ্দিন (তখন তিনি সবেমাত্র খান সাহেব হয়েছেন) তাঁর কালো রংচটা ছেঁড়া আচকান পরে কোর্ট-অভিমুখে রওনা হচ্ছেন, এমনি সময়ে তাঁর স্ত্রী আমেনা খাতুন তাঁর মাথায় এক পাতিল ডাল ফেলে দিয়েছিলেন। ব্যাপারটা এত আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত হয়েছিল যে, তার সমার্থ বুঝবার জন্য খান সাহেবকে সারাদিন বৈঠকখানায় বসে গুড়গুড়ি ফুঁকতে হয়েছিল। বলাবাহুল্য তিনি সমার্থ ভেদ করতে পারেন নি, কাজেই স্ত্রী-প্রহারের সিদ্ধান্ত যে করেছিলেন সেটা যুক্তির ভিত্তিহীন উপসংহার।
ছেলেরা তখন বড়। প্রথম ছেলেটি বিড়ি ফুঁকে ঠোঁট কালো করে এনেছে প্রায়। বড় মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে, মেজো মেয়েটি কোরান-হাদিস নামকেওয়াস্তে শেষ করে প্রেম করবার তল্লাশে আছে। তারা সবাই দেখল, এবং হয়তো মায়ের চোখে দেখল হঠাৎ জ্বলে ওঠা উন্মত্ততার আগুন। সুফিয়া—যার বয়স তখন আট—বাপকে ডালের মতো হলদে তরল পদার্থে ভূষিত দেখে খিলখিল করে হেসে উঠেছিল, শেষে ব্যাপারটার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments