রবীন্দ্রসাহিত্যে হাস্যরস
মানুষের আচরণে অসংগতি-অশোভনতার অন্ত নেই, এই বিচিত্র অসংগতির প্রতিক্রিয়ায় আমাদের মনে যে বিরক্তি ক্রোধ প্রভৃতি আবেগের উদয় হয় তারও অন্ত নেই। এই আবেগগুলি নির্ভর করে দ্রষ্টার মানসিক অবস্থা কিংবা মননভঙ্গির উপরে। এসব আবেগের মধ্যে একমাত্র কৌতুকানুভূতিই আমাদের পক্ষে বিশেষভাবে প্রীতিকর। তাই স্বভাবতই এই কৌতুকবোধকে সাহিত্যের উপজীব্য বলে স্বীকার করা হয়েছে। এই কৌতুককে আশ্রয় করে যে সাহিত্যরসের উদ্ভব হয় তারই নাম হাস্যরস। ভারতীয় আলংকারিকদের মতে হাস্যরসসৃষ্টি সাহিত্যরচনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এবং সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাসের আদিপর্ব থেকেই হাস্যরস সৃষ্টির প্রয়াস দেখা যায়। সংস্কৃত সাহিত্যে যে হাস্যরসের সাক্ষাৎ পাই এবং অলংকারশাস্ত্রে যার বর্ণনা দেখা যায়, মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্যে তারই অনুবর্তন চলে। উনবিংশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত হাস্যরসের বিবর্তনের বা বৈচিত্র্যসৃষ্টির কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। হাস্যরস-রচনার বিপদ এই যে, যদি তা যথার্থ সাহিত্যের পর্যায়ে উন্নীত না হয় তবে তা অনিবার্যরূপেই কদর্য রুচিবিকৃতি বা ভাঁড়ামির স্তরে নেমে যায়। আর সামান্য রুচিবিকারের সংস্পর্শে নির্মল হাস্যরসও গেঁজে উঠে ভদ্রসমাজের অযোগ্য হয়ে পড়ে। বস্তুতঃ হাস্যরস রচনার প্রয়াসটাই অনেক সময় হাস্যকর হয়ে ওঠে। কবি ঈশ্বর গুপ্তের সময় পর্যন্ত বাংলাসাহিত্য এই নিম্নস্তরের রুচিবিকারের অজস্রতায় পরিপূর্ণ। অতঃপর মধুসূদন, দীনবন্ধু এবং বঙ্কিমচন্দ্রের সময়ে ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবে বাঙালির হাস্যরসে নূতন স্বাদগন্ধ দেখা দিল। তখন থেকেই বাংলা হাস্যসাহিত্যের ইতিহাসে নূতন অধ্যায়ের সূচনা হল। কিন্তু পূর্ববর্তী যুগের আবিলতা ঘুচিয়ে পরিশ্রুত নির্মল হাস্যরস সৃষ্টি করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। বাংলার হাসিকে অনাবিল আনন্দের আলোতে যাঁরা উজ্জল করে তুলেছেন, তাঁদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর দুর্গেশনন্দিনীতে হাসবার যে চেষ্টা দেখা যায়, তাকে কিছুতেই উচ্চাঙ্গের বলে বর্ণনা করা চলে না। তার সঙ্গে লোকরহস্য বা কমলাকান্তের যে ব্যবধান তা কালের মাপে খুবই স্বল্প, কিন্তু রসোৎকর্ষের মাপে তা উপেক্ষণীয় নয়।
হাস্যরসসৃষ্টিতে বিশেষ প্রতিভার প্রয়োজন এবং প্রতিভার প্রকৃতিভেদে হাসির রচনাতেও বৈচিত্র্য ঘটে। তা ছাড়া উপলক্ষ্য বা উপাদান-ভেদেও হাসির রূপভেদ হয়। রহস্য, পরিহাস, কৌতুক, ব্যঙ্গ, রঙ্গ, রগড়, মজা, তামাশা প্রভৃতি আসলে পরস্পরের ঠিক প্রতিশব্দ নয়। এগুলির মধ্যে যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে তদনুসারে আমাদের হাসিতেও বৈচিত্র্য দেখা দেয়। বিভিন্ন ফলের স্বাদে বা ফুলের গন্ধে যে বিচিত্রতা, বিভিন্ন ধরণের হাস্যরসেও সেই বিচিত্রতা। বঙ্কিমচন্দ্রের আমল থেকেই বাঙালির দস্তবিকাশ-ভঙ্গিতে নিত্যনবীনতা দেখা দিতে আরম্ভ করেছে। দ্বিজেন্দ্রলাল, অমৃতলাল, রবীন্দ্রনাথ, বীরবল, পরশুরাম, সুকুমার রায় প্রভৃতি আমাদের যে হাসির রস পরিবেশন করেছেন তার স্বাদপার্থক্য যিনি অনুভব করতে পারেন না, তাঁকে রহস্যনিবেদন দুর্ভাগ্যেরই নামান্তর। এই স্বাদপার্থক্যের কারণ-বিশ্লেষণ বর্তমানে আমাদের বিবেচ্য নয়। তবু একটিমাত্র কথা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। মানুষের কাছে ফলের গন্ধের যে ব্যঞ্জনা, মৌমাছির কাছে ফুলের গন্ধেরও তাই; উভয়ত্রই ভোজ্যত্বের ইঙ্গিত অনতিপ্রচ্ছন্ন। ওই গন্ধে যে আনন্দের উদ্ভব হয় তা অহেতুক নয়। পক্ষান্তরে মানুষের কাছে ফুলের গন্ধের যে ব্যঞ্জনা, তাতে রসনাগ্রাহ্যতার আভাসমাত্রও থাকে না। এভাবে দেখলে বলা যায় হাস্যরসের রচনাও মোটামুটিভাবে দ্বিবিধ। এক শ্রেণীর রচনা হাসির গন্ধে মানুষের মনকে আকর্ষণ করে কোনো গুঢ় উদ্দেশ্য নিয়ে, আর এক শ্রেণীর রচনা ফুলের সৌরভের মতো শুধু হাসির মাধুর্য বিকিরণ করেই সার্থকতা লাভ করে। এই যে উদ্দেশ্যনিরপেক্ষ হাস্যরস, তা ফলশস্যের মতো কোনো স্কুলবস্তুকে আশ্রয় করে থাকে না; তার আশ্রয় ফুলের পাপড়ির মতোই লঘু ও পেলব, তার স্পর্শে কেউ আহত হয় না। এই অহেতুক লঘু হাসির উপলক্ষ্য হতে পারে দুনিয়ার সব কিছুই, এমন কি রচয়িতা নিজেও। বিলেতি শিক্ষার মোহগ্রস্ত সাহেবম্মন্য বাঙালিকে লক্ষ্য করে মধুসূদন তাঁর 'একেই কি বলে সভ্যতা' প্রহসনে নব বাবুর মুখে বসিয়েছেন এই উক্তি।—
জেন্টেলম্যেন, আমাদের সকলের হিন্দুকুলে জন্ম, কিন্তু আমরা বিদ্যাবলে সুপরষ্টিসনের শিকলি কেটে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments