অবসর কাব্য
হাতে এত অবসর যে মনে হয় আকাশটা কত বড় হয়ে উঠেছে : এত বিশাল এত গভীর এবং এত মৌন আকাশ সে যেন দেখে নি কখনো। দেহ শুধু ক্লান্তিতে জড়িয়ে ওঠে, আর সে ক্লান্তিতে কেমন নেশা।
এখন সকাল। বোশেখি রোদ এখনো তেতে ওঠে নি, পশ্চিমের ঘরটায় এখনো কোমল ছায়া। দক্ষিণের জানলার পাশে ডেক-চেয়ারে আমজাদ বসে রয়েছে নিশ্চুপ হয়ে, আর হয়তো চেয়ে দেখছে অদূরে মাইল-স্তম্ভের পাশে বুড়ো জামগাছটার পানে। মৃদু-মৃদু হাওয়া বইছেই, জামগাছের পাতা নড়ছেই। কিন্তু কখনো-কখনো হাওয়া জোর হলে জোরে কেঁপে ওঠে, আবার স্তব্ধ হয়ে গেলে গাছময় এ-অবসরের মতো নিশ্চলতা জমে ওঠে। বাসাটা শহরের প্রান্তে বলে এধারে কোলাহল নেই এবং কোলাহল নেই বলে ওর মন শান্ত ও গভীর, স্বচ্ছ ও স্তব্ধ, যেন দিঘির মতো, যেন মনের তলে অনেকটা দূর দৃষ্টি চলে।
ওধারে আরেক জানলার ধারে বসে আমজাদের স্ত্রী আয়েশা যে মাথা নিচু করে সেলাই করছে নীরবে, ওর-ও দেহময় জমাট অবসর। হাত দুটি যে নড়ছে তা যেন মৃদু হাওয়ায় কম্পমান জামগাছের পাতা। ওর এলোচুলে ঢালা বিরাম, মুখটি যেন ভাস্কর-মূর্তি। ধরা-ছোঁয়ার বাইরে ও, সাগরের অপর তীরে যেন বসে রয়েছে, কথা কওয়া যায় না তার সাথে।
তবু বাইরে কাকগুলো কর্মব্যস্ত। এধার-ওধার ছুটোছুটি করছে ক্রমাগত। (কাক নাকি বাঁচে বহুদিন। কালের কালিমা কি তাদের কালো দেহে?) ছুটোছুটি করছে আর ডাকছে কর্কশভাবে, এবং দু-ই মনে বিরক্তি আনে। দেখ না চিলগুলোকে, দূর আকাশে উড়ছে কেমন—ধীরে-ধীরে; যখন ডাকে তখন মনে হয় আকাশে একটা অদৃশ্য শব্দরেখা খেলে গেল, দীর্ঘ অতি দীর্ঘ এবং হয়তো-বা সোনালি সে-রেখা। আর ওরা কেমন প্রবুদ্ধ-ধীরতায়, মনে হয় ওরা জ্ঞানী, প্রচেতা, ঘুরে-ঘুরে উড়ে পৃথিবীর মানুষকে চেয়ে চেয়ে দেখে (এবং দেখে দয়া করে কি মানুষদের?)।
মানুষের মন যখন অবসরের বিপুল শূন্যতায় তলিয়ে যায়, তখন তার চারপাশের পরিচিত মানুষটাও কতটা অচেনা আর ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে? আমজাদের তারাময় আকাশের পানে চেয়ে থাকা স্থির, ভাষাশূন্য চোখ দেখে আয়েশার মনে জেগে ওঠে এক অদ্ভুত ঘৃণা আর শঙ্কা। যে অবসর একসময় মুক্তির গান শোনায়, সেই অবসরই কি তবে একসময় রূপ নেয় এক অবশ করা মনস্তাত্ত্বিক দৈত্যে?
বেশি চুপচাপ থাকলে অনেক সময় সত্তাকে টোকা মেরে দেখতে হয়। তাই আমজাদ কথা কইবার চেষ্টা করল। প্রথমে শ্লেষে কথা আটকে গেল, শেষে যা বের হল হঠাৎ তা কর্কশ ও জোরালো শোনাল।
—কাকগুলো কেমন ডাকছে, কানে লাগে বড়।
কথা তেমন কিছু নয়। আয়েশাও মামুলি উত্তর দিলে : সত্যি কানে লাগে বড়।
একটু পরে আমজাদের মুখ দিয়ে একটা লম্বা বাক্য বের হল : বুঝলে, যখন তুমি জেগে থাক তখন কাক কানের কাছে চিৎকার করলেও শুনবে না তা, কিন্তু যে-ই তোমার চোখে একটু তন্দ্রা এসেছে অমনি সে চিৎকার অতি কর্কশভাবে বাজতে থাকবে কানে-কানে তো ঠিক নয়, যেন শিরায় শিরায়।
বলে আমজাদ ভাবলে, এস্রাজের যদি প্রাণ থাকত, তাহলে আনাড়ি বাজিয়ে যথেচ্ছভাবে বাজালে এস্রাজের যে-ভাব হত, কাকের ডাকে ঠিক সে রকম ভাব হয় যেন তন্দ্রাচ্ছন্নের। আমরা মানুষরা বাদ্যযন্ত্র বৈকি।
এবার আয়েশা চোখ তুলে তাকাল আমজাদের পানে। কী যেন তাকিয়ে দেখল, তারপর চোখ নাবিয়ে বললে : তোমার তন্দ্রা এসেছিল নাকি?
—না তো!
দৈহিক তন্দ্রা না এলেও হয়তো মানসিক তন্দ্রা এসেছিল।
তারপর কথা থেমে গেল। বাইরে রোদ চড়ছে, হাওয়া উঠছে গরম হয়ে। এখন রোদে দাঁড়ালে ত্বক চিনচিন করবে, আর হয়তো গরম হাওয়ায় নাক জ্বালা করবে। কিন্তু তবু, পশ্চিমের এ-ঘরটায় এখনো কিছু ছায়া কিছু শীতলতা, আর জামপাতা-কাঁপিয়ে মৃদু-মৃদু যে-হাওয়া আসে সে-হাওয়া ভারি ভালো লাগে।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments