রক্ত ও আকাশ
বৃদ্ধ লোকটি যখন তার কথার মাঝামাঝি এসে পৌঁছেছে তখন যুবকটি মুখ তুলে তার পানে কয়েকবার তীক্ষ্ণভাবে তাকাল। ধারালো খাড়া নাক, মাথায় লাল ফেজ ; আর তার মোটা, রুক্ষ ঠোঁটটা কেমন আলগোছে ঝুলছে। তারপর সে বৃদ্ধের চোখের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকাল, কতক্ষণ শুনল। কিন্তু আশ্চর্য, বৃদ্ধের কথা কখন শেষ হল সে টেরই পেল না, কারণ তার আগেই এক সময়ে হঠাৎ কী হল, সে যেন গড়িয়ে গেল, ধসে গেল, তারপর জানল যে সে রক্ত দেখেছে। অন্তত তেমনি তার মনে হল। সে রক্ত দেখল, যে-রক্ত কেমন একটু বিচিত্র ধরনের আর যা কেমন নিঃশব্দে গড়িয়ে গড়িয়ে এসে রক্তের সাগর তৈরি করছে।
সে অনেকক্ষণ এসব দেখল। কিন্তু শীঘ্র তার বিরক্তি ধরে গেল। শুধু বিরক্তি নয়, সে যেন প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়ল। লাল রক্তের একঘেয়েমি তাকে একেবারে কাহিল করে ফেলল। যে-রক্ত নদীর মতো নেবে আসছিল তা-জীবন্ত, আর তার শেষ নাই বলে মৃত্যুহীন। সুতরাং সে ভীত হয়ে উঠল : এ-সংকীর্ণ জীবন তাকে ভীত করল, এবং ক্ষিপ্তের মতো সে বৃহত্তর ও শক্তিশালী জীবনের জন্য এধার-ওধার খুঁজতে লাগল। তেমন জীবনের তার প্রয়োজন, যা-বয়-না কিন্তু ঠিক জীবন বটে।
আমি যা আবিষ্কার করেছি তা হল এই যে নীল রং হল লাল রঙের প্রতিষেধক। আমি বিশ্বাস করি যে আমার এ-আবিষ্কার যদি প্রচারিত হয় তবে আমি নিঃসন্দেহে ইতিহাসের এক নায়ক হব ... আমাকে এত লাল রং দেখতে হয়েছিল যে সে-রঙে আমার চরম বিরক্তি ধরে গেল । এই সময়ে একদিন প্রায় অকারণে আমি নীল আকাশের পানে তাকালাম বলে আশ্চর্য রকমে বেঁচে গেলাম।
শীঘ্র সে হাঁপাতে লাগল এবং তাবলে তার মৃত্যু ঘনিয়েছে এমনি সময়ে সে ওপরের পানে তাকাল, তাকিয়ে দেখলে ওপরে নীলিমা : আকাশ। অবশ্য এখানে-সেখানে শুভ্র সাদা উড়ন্ত মেঘ ছিল বটে। কিন্তু সে-গুলো মৃত বলে কিছু এসে--গেল না। এবং এইভাবে সে বেঁচে গেল; পুনর্জন্ম লাভ হল তার।
বৃদ্ধ লোকটি ততক্ষণে থেমেছে। ঘরের নীরবতায় এবার যুবকটি সেকথা জানতে পেলে, পেয়ে তার পানে তাকিয়ে দেখলে উচ্চশিখরে লাল ফেজ। কিন্তু অত ওপরে তাকাতে তার যেন কষ্ট হল বলে সে-দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বাইরে নিক্ষিপ্ত করলে, এবং সঙ্গে-সঙ্গে তার সে-দৃষ্টি বাইরের বিশালতায় ছড়িয়ে গেল, হয়তো হারিয়েও গেল। সেখানে আলো, রহস্যময় বিচিত্র আকাশ এবং সেখানে বর্তমানেরও ছায়া; যে-ছায়া হিংস্র অপরাজেয় জন্তুর মতো কয়েক মুহূর্ত ঘোরাঘুরি করে মিলিয়ে গিয়ে অতীত হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু শীঘ্র বৃদ্ধ লোকটি আবার কথা কইতে শুরু করল। তার কণ্ঠ কিন্তু যুবকের কানে এমন শোনাল যে, তা যেন কাঠের মেঝেতে ঘষে ঘষে যাচ্ছে। কারণ সে যা-বলছিল তা নিতান্ত অবান্তর, অপ্রয়োজনীয়। হয়তো সে খোদা ও শয়তান নিয়ে কিছু বললে। কিন্তু শীঘ্র যুবকের খেয়াল হল যে এ-অবান্তর কথার আবরণের অন্তরালে কিছু একটা আছে যা ধীরে-ধীরে, থেমে থেমে, অতি সন্তর্পণে এগিয়ে আসছে। সে ভাবল, তা হোক গে; আসুক আগে, তারপর দেখা যাবে। কিন্তু বৃদ্ধ লোকটি বলতে লাগল যে, ইদানীং খোদার দুনিয়া কেমন শুকিয়ে শুষ্ক হয়ে উঠেছে; কারণ তার লোকরা আর আজকাল কাঁদে না, অনুতাপ করে না, এবং এ-সমস্ত খোদা দেখছেন নিঃশব্দে, অগোচরে থেকে। তবে যুবকটি এ-ধরণীর তৃষ্ণাও বোধ করলে না, তার নীরব আর্তনাদও শুনল না।
বৃদ্ধের পাশে যে-ছোট মেয়েটি বসে ছিল আর থেকে-থেকে তার আধময়লা লম্বা কোর্তার প্রান্ত ধরে টানছিল সে এবার হঠাৎ ভীত হয়ে গেল। এক সময়ে সে তীক্ষ্ণ গলায় আর্তনাদ করে উঠল। দিশেহারার মতো বৃদ্ধের কোর্তার প্রান্ত টানতে টানতে সে বললে, দেখ, দেখ, লোকটা পাগল।
বৃদ্ধ চমকে উঠল। মেয়েটির সূচের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments