সিন্দুরের ফোঁটা
৪০ সালে ঢাকা শহরে হিন্দু মুসলমানে যে দাঙ্গা বেধেছিল, তা বছরের পর বছর তুষানলের মতো জ্বলছিল। মাঝে মাঝে সৃষ্টি হচ্ছিল দাবানলের। ধুতি আর লুঙ্গি, সিঁদুরের ফোঁটা আর বোরকাই হয়ে উঠছিল পুরুষ কিংবা স্ত্রীর পরিচয়। দুই তরফের বিত্তশালীদের সঙ্গে সঙ্গে একান্ত গরীবদের মধ্যেও এই সরঞ্জামগুলো মনের মধ্যে পরিচয়ের চিহ্ন হয়ে উঠছিল।
কলেরা আর বসন্তে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর মতোই শেষ পর্যন্ত দেশভাগের চিন্তা দেশের মানুষের মনে বাসা করলো। ভাইয়ে ভাইয়ে এবং ভ্রাতৃবধূতে ভ্রাতৃবধূতে মন কষাকষি ও মুখ দেখা বন্ধের নাটকে পৃথক হবার যে পরামর্শ বিষ ফোড়ার মত সকলের মনকে টনটনিয়ে দেয় সেই পরামর্শে কান পাতলো দেশের বড় বড় বুঝদার নেতারাও। শেষ পর্যন্ত হাড়ি আলাদা হলো, মাঝখানে দেয়াল উঠলো। ৪৭ সালে উপমহাদেশ ভাগ হয়ে গেল।
সবাই ভাবলো, যাক একটা হেস্তনেস্ত হয়ে গেলো। দুদিকে যার ভাগে যা পড়বে সে একটা আস্ত টুকরা। কিন্তু দেখা গেল, রাতারাতি পাঞ্জাবে যা হলো কলকাতা কিংবা ঢাকায় তা রাতারাতি সম্ভব হলো না। যা হবার নয় তা হবে কি করে? কিন্তু এই প্রশ্নকে ধামাচাপা দিতে আবার সেই পন্থা; এই সমস্যার গায়ে হাত দিতে যাওয়া পণ্ডশ্রম। যা হবার তা সময়ে আপনি হবে। সুতরাং কলকাতায় যেমন দেশভাগের পর বারবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে, ঢাকাতেও তেমনি বারবার দাঙ্গা হয়েছে।
১৯৬৪ সালের জানুয়ারীতে এইভাবেই আবির্ভূত হলো দাঙ্গার অনিবার্যতা। পৌষ সংক্রান্তিতে ঢাকার সব চেয়ে বড় হিন্দু চাকলায় যখন শত শত ছাদ থেকে হাজার হাজার উৎসাহীর উল্লাসের চীৎকারের সঙ্গে সঙ্গে ঘুড়ি উড়ছিল একটাই আকাশে ঢাকার ‘হাংক্রাইনের’ হিন্দু মুসলমানের একই দিনের ঘুড়ি ওড়ানোর পাল্লাপাল্লির জের হিসেবে বহুকালের, তখন ভোর বেলাতেই ঢাকা থেকে পনেরো মাইল দূরে মিল এলাকায় হত্যাকাণ্ড আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। সন্ধ্যার পর ঢাকা শহরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবাজরা তাদের আগুন দেয়া, লুটপাট আর হত্যালীলা শুরু করে দিল। ঢাকায় মনে হলো ৪৭ সালে যা হয়নি আজ রাতেই সেই ফয়সালা হয়ে যাবে।
ঢাকায় কয়েকটা খবরের কাগজ দিন কয়েক আগে একটা সংক্ষিপ্ত আবেদন জানিয়েছিল, যেখানে যাই হোক না কেন, ঢাকায় যেন দাঙ্গা না হয়। এই কাগজগুলো ছিল প্রধানত তখনকার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মুখপত্র। এই রকম একটা কাগজের অফিসের দোতলায় ১৪ই জানুয়ারীর রাতে একটা টেবিলের চারদিকে জড়োসড়ো হয়ে বসেছিলেন বুদ্ধিজীবীরা। এদের মধ্যে ছিলেন এক মহিলা অধ্যাপিকা। ছিলেন একজন ডাকসাইটে সাংবাদিক ৷ এদের মধ্যে কয়েকজন সকালবেলায় গ্রামাঞ্চলে মিল এলাকায় যেখানে হাঙ্গামা শুরু হয় সেখানে জীপ নিয়ে সংখ্যালঘুদের আশ্বাস দিতে গিয়েছিলেন। ফিরে এসেছিলেন তাঁরা পঙ্গুত্বের প্রমাণ দিয়ে। অসহায় নর-নারী, শিশুর চীৎকার আর আগুন আর রক্ত আর লাশের ছবি চোখে নিয়ে ফিরে এসেছিলেন জীপে চড়ে ৷ সেই জীপটা তখন কাগজের অফিসের দরজায়। সাংবাদিক কাঁদতে লাগলেন। বললেন, আমরা ব্যর্থ।
কেউ তাঁর কান্নায় বাধা কিংবা প্রবোধ দিলেন না।
রাত দশটায় জানা গেল যথারীতি ১৪৪ ধারা জারী হয়েছে, কার্ফিউ জারীর সম্ভাবনা রয়েছে। সুতরাং এবার ঘরে ফেরার পালা। টেলিফোনে জানা গেল মহিলার ভাই গাড়ী নিয়ে আসছেন। ঢাকায় মুসলমানরাই দাঙ্গা করেছে কলকাতায় যেমন হিন্দুরা করেছে। মহিলা এবং তার ভাই মুসলমান। সুতরাং দাঙ্গায় তাঁদের কোন ভয় নেই ৷
মহিলার ভাই আসার পরে অন্য সকলেও সেই গাড়ীতে পাড়ি দেবার জন্য উঠে পড়লো। হঠাৎ একজন বুদ্ধিজীবী আর্তনাদ করে ওঠার মতো করে বলে উঠলেন, এটা কি? তিনিই মহিলার কপালের দিকে আঙ্গুল তুলে বললেন, এ যে সিঁদুরের ফোঁটা। এ চলবে না।
এই মহিলা অধ্যাপিকা অবশ্যই সিথিতে সিদুঁর দেন না, দেন কপালে। খুব বড় করেই দেন। সবাই জানে তাঁকে। অত্যন্ত একরোখা ৷ জাদরেল। অনায়াসে বড় বড় মোটর গাড়িকে দক্ষ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments