আয়ত দৃষ্টিতে আয়ত রূপ
এক শতাব্দী আগে কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোর ইতালীয় অনুবাদের ভূমিকাতে এঙ্গেলস লিখেছিলেন, ‘ইতালির শ্রমিকশ্রেণী থেকে নতুন দান্তে বেরিয়ে আসবেন।” শোষণমুক্ত সমাজের জন্যে শ্রমজীবী জনগণের লড়াই রূপের জগৎকে কিভাবে সঙ্গী হিসেবে দেখে, এঙ্গেলসের উক্তিটিতে তার ইঙ্গিত রয়েছে। এক কথায় একে বলা যেতে পারে আয়ত দৃষ্টিতে আয়ত রূপের দিশা। যেমন এর বিশালতা, তেমনি এর গভীরতা। এ শুধু ভাব নয়, এ হচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে অবিশ্রান্ত সৃষ্টি আর কাজ ৷ দেশে দেশান্তরে যুগে যুগান্তরে মেহনতী মানুষের ‘রূপ লাগি ঝুরে মন'। তার অসংখ্য অজস্র অভিব্যক্তি। সমস্ত অবক্ষয় ও আবিলতা ও মৃত্যুকে সরিয়ে সরিয়ে ‘অভিনব ধরণী' গড়ার জন্যে মানবাত্মাকে অপরূপ রূপে সাজানো ৷ এরকমের একটি প্রেক্ষিত সামনে থাকাতে আমাদের অসমাপ্ত বিপ্লবের উপমহাদেশের সমস্ত দুঃখদৈন্যের ও বিকারের এবং আশাভঙ্গের মধ্যেও কমিউনিস্ট কবি মখদুম মহীউদ্দীন বলতে পেরেছেন, “আমি সূর্যকে পান করেছি।” কালো আফ্রিকার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আমিলকার কাব্রাল মৃত্যুর আগেই লিখে রেখে গিয়েছেন, “মুক্তিযুদ্ধ একটা সাংস্কৃতিক দ্যোতনা। আফ্রিকার মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রভাণ্ডার যুগ-যুগান্তর ধরে গড়া গণ-মানবমানবীর রূপের জগৎ।” মায়াকভস্কি বলেছিলেন, “আনন্দধারা বহিছে ভুবনে, এসো বালতি ভরে নাও।” কখনও বলেছেন, “প্রাণের ঝর্ণা বয়ে চলেছে বাধাবিপত্তি ভেদ করে, পুরো ঠোঁট ডুবিয়ে পান করো।”
এই সত্যকে সচেতন কমিউনিস্টদের তো জানার কথা, বলার কথা। তবু, মাঝে মাঝে দেখা যায়, কোথাও কোন সমাজতান্ত্রিক দেশে বিচ্যুতি ঘটলে কিংবা সংকীর্ণ চিন্তা মাথা তুললে, যারা নিজেদের মার্কসবাদী মনে করেন তাঁদেরও কেউ কেউ বলে বসেন, ‘সমস্ত যজ্ঞটাই পণ্ড। দোষটা কমিউনিজমেরই, দোষটা মার্কসবাদেরই।' আত্মগ্লানিতে এঁরা আশেপাশের আবহাওয়া ভারী করে তোলেন।
অথচ ইদানিংকার কত ঘটনাই তো আমাদের সামনে রয়েছে, যাতে নব নব ব্যবস্থায় কমিউনিস্টদের আয়ত দৃষ্টিতে আয়ত রূপের দিশা প্রমাণিত। শুধু প্রমাণিত নয়, প্রসারিত। দুটো ঘটনার কথা এখানে বলা যায় ৷
II ২ II
একটা ঘটনা ঘটেছে '৮১ সালের আগস্ট মাসে। গ্রীসের বিশ্ববিদিত কমিউনিস্ট মুক্তিযোদ্ধা সুরকার মিকিস থিওডোরাকিস কিউবার রাজধানী হাভানাতে গণনাট্যের ধারায় একটি বিশেষ ‘বৃন্দগান, আবৃত্তি ও বৃন্দবাদ্যের বিষয়—পাবলো নেরুদার 'সাধারণ গান' অনুষ্ঠান' পরিবেশন করেছেন। (ক্যান্টো জেনারেল) কাব্য। বর্তমান শতাব্দীর মধ্যাহ্নে রচিত নেরুদার এই কাব্যগ্রন্থটি ইলিয়া এরেনবুর্গের ভাষায় নতুন ধরনের উপন্যাস। ললিত ও কঠোর গাঁথুনিতে গাঁথা কোমল ও কঠোর চরিত্রাবলীকে নিয়ে লেখা খণ্ড খণ্ড কবিতার অগ্নিমালা। সারা বিশ্বের দেশ-দেশান্তরের মুক্তি সংগ্রামের মর্মবাণী। কেন্দ্র হচ্ছে মেহনতী মানুষের জয়গাথা। মিকিস থিওডোরাকিসের পরিচালনায় একক গানে, সমবেত সঙ্গীতে, আবৃত্তিতে এবং বৃন্দবাদ্য-সঙ্গতে অংশ নিয়েছেন গ্রীস এবং কিউবা ও অন্যান্য দেশের প্রায় দু'শ কুশলী পুরুষ ও নারী শিল্পী।
এই উপলক্ষে হাভানায় একটি সাংবাদিক সম্মেলনে মিকিস বলেছেন,“নেরুদার মৃত্যুসংবাদে গভীরভাবে দুঃখিত হয়েছিলাম। তিনি ছিলেন একাধারে মহৎ প্রতিভা ও বিপ্লবী। তাঁর 'ক্যান্টো জেনারেল' আমাদের সময়ের মহৎ সাহিত্য—মহাকীর্তিসমূহের অন্যতম। সমসাময়িক শিল্পকলা, আমার মতে যা হওয়া উচিত, তার সঙ্গে 'ক্যান্টো জেনারেল' মিলে যায়। জনগণের প্রতি নিবেদিত এই শিল্পকর্মটির পরিধি হচ্ছে বিশাল। জনগণের সঙ্গীত আমাদের স্মৃতিকে জাগিয়ে দেয়। এই জনগণের সঙ্গীতকে ভিত্তি করেই আমি কতকগুলো বিস্তারিত কাজ করেছি। ‘ক্যান্টো জেনারেল' এদের একটি। আমার কাছে ‘ক্যান্টো জেনারেল' কাব্য হচ্ছে গণ-নাট্য-সঙ্গীত। বিশেষ করে যারা জনগণের জন্যে লড়ছে, তাদের হৃদয়জোড়া এর প্রভাব। চিলিতে একভাবে এই কাব্যের সাঙ্গীতিক রূপ দেওয়া হয়েছিল, আমি তা শুনেছিলাম। আমি আরেকভাবে রূপ দিয়েছি। এর কারণ, রূপসৃষ্টির কোন বর্ডার নেই।”
মিকিস থিওডোরাকিস আরও বলেছেন যে, চিলিতে নেরুদা ও সালভাদর আলেন্দের সঙ্গে তাঁর আলাপ ‘ক্যান্টো জেনারেল'-এর সঙ্গীতালেখ্য তৈরীর জন্যে তাঁর সাধ ও স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার ব্যাপারে সহায়ক হয়েছে।
তবে, হাভানার এই অনুষ্ঠানের খবরে আরও জানা গিয়েছে যে, অনুষ্ঠানটি নেরুদার মাতৃভাষাভাষী দেশের মধ্যে কিউবাতেই প্রথম আয়োজিত হয়েছে।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments