রণেশ দাশগুপ্ত : শেষ সাক্ষাৎকার (প্রথম অংশ)
[বহুদিন ধরেই আমাদের পরিকল্পনা চলছিল রণেশদার সাক্ষাৎকার নেওয়ার। ব্যক্তি হিসাবে যেমন বিশাল তাঁর মাপ, তেমনই সুদীর্ঘ সময়ের অগাধ, গভীর ও মূল্যবান অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ তাঁর জীবন। স্বাধীনতার আগে ও পরে সাত দশকের অধিককাল জুড়ে চলে তাঁর কর্মকাণ্ড। চলে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে, কখনও প্রকাশ্যে, কখনও গোপনে, কখনও জেলখানার ভেতরে, কখনও বাইরে। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক সর্বক্ষেত্রেই তার অবাধ ও স্বচ্ছন্দ বিচরণ। তার সমস্ত কর্ম, ভাবনা ও সৃষ্টির মূলে একটিই স্বপ্ন, মানুষের মুক্তি। ক্ষুধা ও দারিদ্র থেকে নয়, অন্তরে বাহিরে যাবতীয় পীড়ন ও বন্ধন থেকে মুক্তি। এই মুক্তির সংগ্রামে তাঁর মন্ত্র ও অস্ত্র মার্কসীয় জীবনবীক্ষা, মানবিকতার সাধনায় শ্রেষ্ঠতম দর্শন। শুধুমাত্র বহু চেষ্টার পর অবশেষে নিজের সম্পর্কে মিতবাক, প্রায় মৌন মানুষ, রণেশদাকে রাজি করানো গেল। আমি ও জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায় ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে লেনিন স্কুলের সেই বিখ্যাত ঘরে তাঁর এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিতে পারলাম। কথাবার্তা মূলতঃ তাঁর সঙ্গে জ্যোতিপ্রকাশেরই হয়, সেই সব কথা ক্যাসেট রেকর্ডারে ধরে রাখার দায়িত্ব শুধু পালন করি আমি। যতদূর জানি, এটিই তাঁর জীবনের শেষ রেকর্ড করা সাক্ষাৎকার। আমাদের প্রশ্ন ছিল অনেক। মাঝে মাঝে রণেশদা নিজেকে একটু গুটিয়ে রাখলেও প্রায়শঃই তিনি কথা বলেছিলেন, সহজ ভাবেই, বন্ধুর মতো, খোলামেলা। প্রশ্ন অনেক রয়ে গেল, আজও রয়ে গেছে। তবে তাঁর যেটুকু কথা রেকর্ড করে রাখা গেছে তার পরিমাণও কম নয়। রণেশদার পরম স্নেহের পাত্র এবং আমাদের অতি প্রিয় মানুষ সাহিত্যপ্রেমিক কল্যাণ চন্দ’র আগ্রহাতিশয্যে রণেশদার সেই সুদীর্ঘ সাক্ষাৎকারের একটি অংশ এখানে প্রকাশ করা হলো। উৎকর্ষের স্বার্থে সামান্য কিছু সম্পাদকীয় সংশোধন ছাড়া সাক্ষাৎকারটি হুবহুই রাখা হয়েছে।—মালবিকা চট্টোপাধ্যায়]
জপ্রচ: আপনি এখন কেমন আছেন?
রণেশ: খুব সুবিধার নয়। হাত ভেঙে যাওয়ার পর নানা স্পেশালিস্ট দেখাচ্ছি…তারা সব বলছেন ইয়ে মানে সব ইয়ে (পরীক্ষা) করে আসুন ওমুক জায়গা থেকে…
জপ্রচ: পরীক্ষা করে আসুন?
রণেশ: কাগজপত্র নিয়ে ছাড়া কথা বলেন না তারা।
জপ্রচ: সে সব হচ্ছে? হার্টের কোনও গণ্ডগোল ধরা পড়েছে কি?
রণেশ: না, সেরকম তো...
জপ্রচ: আপনার আর যা-ই হোক, হার্ট আর মাথার কোনও গণ্ডগোল ধরা পড়ার তো কথা নয় বুকটাও চওড়া।
রণেণ: না, সেই বক্ষপট নেই আর।
জপ্রচ: এখন কি লিখছেন?
রণেশ: এখন তো নজরুল। তার আগে সুভাষচন্দ্র…।
জপ্রচ: নজরুলের ওপর কী করছেন?
রণেশ: নজরুলের আরবি, ফারসী, উর্দু ব্যবহার, কাব্যে, গদ্যে। ওটাই এগোচ্ছে—খানিকটা।
জপ্রচ: আপনি কি আরবি, ফারসী নিয়ে কাজ আগে করেছেন? (করতে) বললো কেন আপনাকে?
রণেশ: উর্দু নিয়ে করেছি।
জপ্রচ: কি করেছেন?
রণেশ: ফয়েজের কবিতা। সাজ্জাদ জাহির—এদের নিয়ে করেছি কাজ...
জপ্রচ: আপনি কি এদের অনুবাদও করেছেন? সেই কবিতার কালেকশন বেরিয়েছে?
রণেশ: আপনি দেখেন নি?
জপ্রচ: না, ভেরি আনফরচুনেট। ফয়েজ আহমদ ফয়েজের একটা অনুবাদ অমিতাভ দাশগুপ্ত করেছেন।
রণেশ: ওটা তো ইংরেজি থেকে। আমারটা ওরিজিনাল উর্দু থেকে।
জপ্রচ: হ্যাঁ, ওটা ইংরেজি থেকে করেছে। আপনার উর্দু থেকে করা...এই কবিতার সংকলনটা আপনার তো জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী বার করেছিল। ঢাকা থেকে বেরিয়েছিল।
রণেশ: আমার সব বই-ই ঢাকা থেকে। একটি মাত্র বই এখান থেকে বেরিয়েছে, কলকাতা থেকে। ‘সাম্যবাদী উত্থান জিজ্ঞাসা—’
জপ্রচ: হ্যাঁ, সেটা কারা বার করেছে?
রণেশ: সেটা বার করেছে উদ্ধব প্রকাশনী।
জপ্রচ: এখন পর্যন্ত আপনার কটা বই বেরিয়েছে?
রনেশ: পনেরোটা।
জপ্রচ: পনেরোটা, তার মধ্যে চোদ্দটাই ঢাকা থেকে আর একটা এখানে। আপনার প্রথম বই কবে বেরিয়েছিল?
রণেশ: প্রথম? ঊনষাট সালে।
জপ্রচ: ঊনষাট সালে?
রণেশ: হ্যাঁ। তখন যা বিভিন্ন কাগজে, সংবাদপত্রে বেরিয়েছিল সেগুলো নিয়ে। একটি ছেলে আমাকে তখন বললো রণেশদা আপনার কোনো বই নেই, আপনাকে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments